ছবি: সংগৃহীত
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বর দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনার ঘোষণার পর একের পর এক প্রতিক্রিয়া এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান ও সাবেক প্রসিকিউশন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকেও।
তাদের বক্তব্যের মূল সুর—যদি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত সত্যিই হয়ে থাকে, তাহলে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে এখনই ফিরে এসে আইনের মুখোমুখি হওয়া উচিত।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই দেশে এ বিষয়ে আলোচনা তীব্র হয়।
শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারও একই উদ্যোগ নিয়েছে। একই সময়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগ্রহের কথাও সামনে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আসিফ নজরুল লেখেন, যদি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তার ভাষায়, "ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা কেন? শেখ হাসিনা, আপনি এখনই দেশে ফিরে আসুন।"
আসিফ নজরুলের মতে, দেশের জনগণ ও আদালতের সামনে শেখ হাসিনার অনেক প্রশ্নের জবাব দেওয়ার রয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে প্রাণহানির দায়, তার শাসনামলে সংঘটিত বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের অভিযান, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, কথিত ‘আয়নাঘর’, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং ভারতের প্রতি বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান—এসব বিষয়ে তার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।
ফেসবুক পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা তার পরিবারের সদস্যদের আগেই বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ সরকারের কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক ও আইনি পরিণতি বহন করতে হয়েছে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা-কর্মীদের। তাদের অনেকে এখনো বিভিন্ন মামলার মুখোমুখি কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পোস্টের শেষাংশে আসিফ নজরুল বলেন, যদি শেখ হাসিনার বাস্তবেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে বিলম্ব না করে আদালতে এসে নিজের অবস্থান তুলে ধরা উচিত। আর যদি এমন কোনো পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে বারবার দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে দলের সাধারণ নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্ত বা অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে না ফেলাই ভালো।
একই দিন, শনিবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলাকেন্দ্রে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের আয়োজনে "জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের স্মৃতি, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ" শীর্ষক অডিও–ভিজ্যুয়াল প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও শেখ হাসিনার ঘোষণার প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসবেন নাকি জানুয়ারিতে আসবেন, সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে। তবে রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে এখনই প্রয়োজন। তার ভাষায়, "ডিসেম্বরে আসবেন, জানুয়ারিতে আসবেন—এটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আপনাকে তো আমরা কালকেই চাই। অতএব কোনো স্ট্যান্টবাজি করবেন না। এখানে আর কোনো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবেন না।"
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, ঘোষিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে শেখ হাসিনার দ্রুত দেশে ফিরে বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে—এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। শনিবার বিকেলে শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত শক্তিগুলোর আবারও দেশে ফেরার ঘোষণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সক্রিয়তা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।
তাজুল ইসলামের ভাষ্য, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তারা এখন প্রকাশ্যে দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সমর্থকদের সক্রিয়তাও বেড়েছে। তিনি বলেন, "আজকে তারা তারিখ দিয়ে বলে ফেরত আসবে। এই দুঃসাহস তাদের হওয়ার কথা ছিল না। এটি সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।"
তার মতে, অভ্যুত্থানের পর প্রথম দেড় বছরে এমন পরিস্থিতি দেখা না গেলেও গত কয়েক মাসে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তিনি মনে করেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন না হলে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অপরাধের বিচার কেবল দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য নয়; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিচার সম্পন্ন না হলে সমাজে ক্ষোভ ও অস্থিরতা জমতে থাকবে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্র সংকটে পড়লে মানুষ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পক্ষে এগিয়ে আসার অনুপ্রেরণা হারাতে পারে।
এদিকে শনিবার বিকেলে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা মিলনায়তনে "নারী অগ্রযাত্রা, শিক্ষা ও ক্যারিয়ার" শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কূটনৈতিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, যারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, তাদের ফিরিয়ে এনে দেশের মানুষের সামনে বিচারকার্য সম্পন্ন করা হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবং বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও তা অব্যাহত রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, শেখ হাসিনার বিচার শেষ হয়েছে এবং তার সাজা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও অনেক স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধেও সাজা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে যারা এখনো দেশের বাইরে রয়েছেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে দেশের মাটিতে বিচার সম্পন্ন ও রায়ের বাস্তবায়নের জন্য সরকার কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনার ঘোষণার পর বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা প্রতিক্রিয়াগুলোতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও আইনি ব্যাখ্যা থাকলেও প্রায় সবাই দ্রুত দেশে ফিরে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কেউ এটিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, কেউ বিচারপ্রক্রিয়ার স্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার সঙ্গে বিষয়টিকে যুক্ত করে দেখছেন।
ফলে শেখ হাসিনার ঘোষিত সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা এখন কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিচারপ্রক্রিয়া, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে বিতর্ক ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন