ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি সৌদি আরবের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত পাঁচ-ছয় বছরে দেশটির সংগীত অঙ্গনও অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের বড় পরিসরের সংগীত উৎসব থেকে শুরু করে স্থানীয় শিল্পীরা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এ সংগীত বিপ্লবের অন্যতম অংশীদার হলো চার নারী সদস্যের সাইকেডেলিক রক ব্যান্ড সীরা (এসইইআরএ)। ২০২২ সালে এ ব্যান্ড গঠিত হয়।
সীরা মূলত রিয়াদভিত্তিক ব্যান্ড। ব্যান্ডের সদস্যরা হলেন গিটারিস্ট হায়া, ড্রামার ‘থিং’ যিনি মুখোশে মুখ আড়াল রাখেন, বেসিস্ট মিশা ও তার বোন নোরা। লিড ভোকাল ও কিবোর্ডেও থাকেন নোরা। সম্প্রতি এ ব্যান্ড সদস্যরা সিন নয়েজের সঙ্গে আলাপে বসেছিলেন। তারা তাদের ব্যান্ড ও সংগীতসহ নানা বিষয়ই তুলে এনেছেন এ আলাপে। তথ্যসূত্র: সিন নয়েজ, গিটার ওয়ার্ল্ড ও ইকোনমিক টাইমস।
সীরা গঠনের আগে ব্যান্ডের প্রত্যেক সদস্যের নিজস্ব সংগীতযাত্রা ছিল। হায়া লন্ডনে মাস্টার্স করছিলেন, সেখানে তিনি জ্যাম সেশনে অংশ নিতেন এবং ওম্বংনিটি নামের এক ইভেন্ট-সিরিজে ইন হাউজ গিটারিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। নাইট শিফট নামের একটি কভার ব্যান্ডে বাজাতেন মিশা। এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ব্যান্ডে ড্রাম বাজিয়েছেন থিং। নোরা এককভাবে ক্লাসিক্যাল পিয়ানো পরিবেশন করতেন।
তাদের যৌথ গল্প শুরু হয় প্রায় এক বছর আগে। হায়ার সঙ্গে ইনস্টাগ্রামে কথা হয় মিশার। মিশাকে হায়া জিজ্ঞেস করেছিলেন সে অ্যাল্টার গুনের অ্যালবাম পছন্দ করে কিনা। মিশা ‘হ্যাঁ’ বললে হায়া তাকে একসঙ্গে জ্যাম করার প্রস্তাব দেন। মিশা তার বোন নোরাকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন, তাদের মধ্যে তৎক্ষণাৎ অসাধারণ সংগতি তৈরি হয়। পরে তারা আল-মাশতালের এক ইভেন্টে থিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন। পরে তাকে দলে নেওয়া হয়, আর সেখান থেকেই সীরার জন্ম।
২০২৩ সালের ৪ঠা মে রিয়াদের দ্য ওয়্যারহাউজে সীরা তাদের প্রথম লাইভ পারফরম্যান্স করে। রিয়াদের ইতিহাসে লাইভ পারফরম্যান্সে সবচেয়ে বেশি দর্শক হয়েছিল এদিন। ২৫০ জনের বেশি দর্শকের সামনে পারফর্ম করে সীরা।
এ পারফরম্যান্স ও তার আগে পরের অভিজ্ঞতা নিয়ে নোরা বলেন, ‘কনসার্টের আগে আমরা অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত ১৩টা মৌলিক গান লিখেছি। এতে প্রত্যেকের নিজস্ব স্টাইলের সেরা অংশটা একত্রে করেছি। হায়া পছন্দ করে আরব সাইকেডেলিক ধাঁচ, আমি ব্লুজ ও জ্যাজের দিকে ঝুঁকেছি, মিশা ফাঙ্ক ভালোবাসে আর থিং সবকিছুর সঙ্গে মিশে যেতে পারে। স্বতন্ত্র ও অনন্য সাউন্ড আনার ক্ষেত্রে আমাদের একটু ভয় ছিল, কিন্তু প্রতিক্রিয়াগুলো দেখে আমরা সত্যিই গর্বিত।’
হায়া যোগ করেন, ‘এখনো মনে হয় কেউ আমাকে চিমটি কাটুক, যেন বুঝতে পারি যে এটা সত্যিই ঘটছে। আমার সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল আর জানি বাকিদেরও তাই।’
ব্যান্ডের নাম সীরা রাখার গল্পও আগ্রহজাগানিয়া। হায়া বলেন, ‘একটা শোর জন্য আমাদের দ্রুত একটা নাম দরকার ছিল। আমরা ‘‘ক্যামেলফাঙ্ক’’ ও ‘মাংকৌশ’’-র মতো নাম ভেবেছিলাম (আমাদের সবার চুল কোঁকড়ানো বলে), কিন্তু শেষে সীরাতে স্থির হই। আমরা চেয়েছিলাম, নামটা আরবি হোক। সীরা মানে গল্প, যাত্রা। আমাদের সবার এ সময়ের গল্পের এক মিশ্রণ এই ব্যান্ড।’
নোরা বলেন, ‘এটা শুধু আমাদের গল্প নয়, সবার গল্প। আমরা এমন বিষয় নিয়ে গান করি, যা সবাই অনুভব করেছে। তাই মানুষ সহজেই এতে নিজেদের খুঁজে পায়।’
সৌদি আরবে প্রথম নারী রক ব্যান্ড হিসেবে তারা যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, সে বিষয়ে মিশা বলেন, ‘আগে বিষয়টা একটু সীমাবদ্ধ ছিল। ভাবিনি কখনো এমন কিছু করতে পারব। কিন্তু এখন অনেক সমর্থন পাচ্ছি। শুরুতে কিছু ঘৃণাত্মক মন্তব্য পেয়েছিলাম। কিন্তু ভালোবাসা আর সমর্থন সে ঘৃণাকে ঢেকে দিয়েছে।’
নোরা যোগ করেন, ‘যখন দেখলাম, শুধু নারীরা ব্যান্ড সংগীত করছে বলে কিছু মানুষ বিরক্ত হচ্ছে, তখনই মনে হলো, ঠিক আছে, এখন দেখাতে হবে যে কী করতে পারি।’
থিং বলেন, ‘যখন কাউকে বলা হয় যে তুমি পারবে না, তখনই সে আরো অনুপ্রাণিত হয়। হ্যাঁ, আমরা একটা নারী ব্যান্ডের সদস্য এবং এটা নিজেই এক শক্তিশালী, অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যাপার। সঠিক পথে নিজেকে প্রকাশ করতে পারার সুযোগ আমাদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে এবং অন্য নারীদেরও সাহস জোগাতে সাহায্য করছে।’
হায়া বলেন, ‘আমাদের মত স্পষ্ট, উদ্দেশ্য মজবুত। বছরের পর বছর ধরে পাওয়া আমাদের প্রেরণা জমে আছে। যে সমালোচনা আসে, তা আমাদের কাছে কিছু অপ্রয়োজনীয় শব্দ ছাড়া কিছুই না। আমাদের কাছে অনেক ‘‘ইয়ারপ্লাগ’’ আছে। আমরা সেই রোল মডেল হতে চাই, যাদের আমরা একসময় খুঁজতাম। নারীদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক একটি গল্প তৈরি করতে চাই।’
সীরার সংগীতে অনুপ্রেরণার প্রসঙ্গ উঠতেই ব্যান্ডের সদস্যরা একসঙ্গে অসংখ্য নাম ছুঁড়ে দেন। তারা জানান ওপেথ, টুল, ইলহাম আল-মাদফাই, দ্য ব্ল্যাক কিজ, কাইরোকে, এল-মোরাব্বা থ্রি, কিং গিজার্ড অ্যান্ড দ্য লিজার্ড উইজার্ড, তালাল মাদ্দাহ ও কুইনস অব দ্য স্টোন এজ দ্বারা তারা প্রভাবিত। ইংরেজি, ফুসহা ও কথ্য আরবিতে তাদের গান তাদের বৈচিত্র্যময় সংগীতকে আরো গভীর করে।
২০২৩ সালে ব্যান্ডটি বেশকিছু পরিকল্পনা নিয়েছিল। সিরাপ লাউঞ্জে পারফর্ম করার পাশাপাশি তারা সৌদির দুটি ব্যান্ডের সঙ্গে পারফর্ম করার পরিকল্পনা রেখেছিল। সে সময় মিশা বলেন, ‘যখনই কেউ আমাদের গানকে ভালোবাসে বা সমর্থন করে, সেটা আমাদের জন্য বিশেষ কিছু। আশা করি, আমরা সবাইকে আরো মুগ্ধ করতে থাকব।’
বাস্তবেও তারা সেটা করেছে। সীরা তাদের প্রথম গান প্রকাশ করে ২০২৩ সালে। ২০২৪ সালে প্রকাশ হয় তাদের অ্যালবাম ‘আল মোজাল্লাদ আল আওয়াল’। এতে নয়টি গান রয়েছে। এগুলো হলো আলম আল আহলাম, শেয়ার থ্রি আল বুহুতরি, আল ফানা, রামি আল সিহাম, খালিক বাইদ, নাফাস, জুনুন আলমাল, ওয়াহাম আল কিম্মাহ ও মওজ আল বাহার। সৌদিতে পারফর্ম করার পাশাপাশি এ গানগুলো বিশ্বজুড়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সীরাকে। এখন তারাও চর্চিত হন অন্যান্য ব্যান্ডের সঙ্গে।
খবরটি শেয়ার করুন