ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিস্থিতি নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন। বিশেষ করে জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে তার করা মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। তার বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এই তিনটি বিষয়কে সামনে এনে ডেভিড বার্গম্যান যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা দেশের চলমান বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন নেটিজেনরা।
ডেভিড বার্গম্যান বলছেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর জুলাই ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হত্যা, বা হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এই ইঙ্গিতই দেয় যে, বিএনপি এমন একটি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তুলছে, যা প্রমাণের ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিদের আটক করা হয় তারা কী প্রতিনিধিত্ব করেন বা কার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা—তার ওপর ভিত্তি করে; প্রমাণযোগ্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে নয়।
তিনি বলেন, এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিএনপি—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অনুগত ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে—আগের আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চালু থাকা একই ধরনের চর্চা অব্যাহত রাখছে বলেই প্রতীয়মান হয়। মূল যুক্তি বা ধারা বদলায়নি। আজ বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক পোস্টে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেন। তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি কর্তৃপক্ষের ভেরিফায়েড করা নয়।
অনেকে নেটিজেনর মতে, বার্গম্যানের এই বক্তব্যে সরাসরি রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ—দুই প্রধান দলের শাসনামলের ধারাবাহিকতা নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পুনরাবৃত্ত চিত্র তুলে ধরে। তার মতে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও আইন প্রয়োগের ধরন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তারের অভিযোগের ধারা খুব একটা বদলায়নি।
ডেভিড বার্গম্যান বলেন, "এ ধরনের গ্রেপ্তার আসলে কী বোঝায়, তা পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। এ ধরনের আটকাদেশ কার্যকর করতে রাজনৈতিক নেতারা—যারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই এর অনুমোদন দিয়েছেন—পুলিশ কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটদের ওপর নির্ভর করেন, যাতে তারা বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হন।"
এই বক্তব্যে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। দেশের আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার ও আটক প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে, যা নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বার্গম্যান সে প্রসঙ্গ টেনে বলেন, "বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কাউকে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আটক রাখতে হলে অভিযোগটি “যথেষ্ট ভিত্তিসম্পন্ন” বলে প্রমাণিত হতে হবে। একইভাবে, ম্যাজিস্ট্রেটদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে এই মানদণ্ড প্রয়োগ করে আটকাদেশের বৈধতা নির্ধারণ করার। শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এই মানদণ্ড পূরণ করে—এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না থাকলে (এবং এই ক্ষেত্রে তা স্পষ্টতই অনুপস্থিত), পুলিশের উচিত ছিল তাকে ছেড়ে দেওয়া। তা না হলে, ম্যাজিস্ট্রেটের হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল।
বার্গম্যানের অভিযোগ, তাদের এই ব্যর্থতা একটি গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার প্রতিফলন: পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা রাজনৈতিক প্রভুদের স্বার্থে আইন ভাঙতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে, তারা তা নিয়ে আর ভাবেন না; বরং কীভাবে আইন প্রয়োগ করা উচিত, সেটিই হয়তো ভুলে গেছেন। সাবেক স্পিকারের গ্রেপ্তার আরও একটি বিষয় ব্যাখ্যা করে—বিএনপি কেন বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে (যা আমার আগের লেখার বিষয় ছিল)।
বার্গম্যানের এই মন্তব্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি মনে করেন, বিচার বিভাগ যদি কার্যকরভাবে স্বাধীন হয়, তবে নির্বাহী বিভাগের পক্ষে ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তার ভাষায়, "কারণ, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের পক্ষে ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আর এই স্বাধীনতা না থাকলে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে গ্রেপ্তার ও আটক ব্যবহারের সক্ষমতা অটুট থাকে।"
দেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। সংবিধানিকভাবে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকায় এই প্রভাব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি।
ডেভিড বার্গম্যানের মতে, "মূলত, প্রমাণের সীমাবদ্ধতা ছাড়াই কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা বাংলাদেশের দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এবং ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে অত্যন্ত আগ্রহী। এখানে একটি উল্লেখযোগ্য বিদ্রূপও রয়েছে। বর্তমানে যারা সংস্কারের পক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার—মূলত বিরোধী দল ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী—যাদের কাছ থেকে এমন গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আশা করা যেতে পারে, তারা কেবল সাবেক স্পিকারের মতো কারও আটক নিয়ে উদ্বিগ্ন নন, বরং তা সমর্থনই করছেন।"
তিনি বলেন, "কেন? কারণ তাদের কাছে রাজনৈতিক প্রতিশোধের তাগিদ নীতিগতভাবে আইন প্রয়োগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে যা একটি ইচ্ছামতো স্বাধীনতা হরণ—যা আইন ও সংবিধান উভয়েরই পরিপন্থী—তা তাদের কাছে “ন্যায়বিচার” হিসেবে উপস্থাপিত হয়, কারণ এটি “সঠিক” লক্ষ্যবস্তুর ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে—অর্থাৎ তথাকথিত ‘ফ্যাসিস্ট’ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত কারও বিরুদ্ধে। তারা কেবল তখনই এ ধরনের নির্বিচার আটক নিয়ে সমালোচনা করে, যখন তারা নিজেরা—অথবা তাদের সমর্থকেরা—এর শিকার হয়।"
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা মতে, এই বক্তব্যে বার্গম্যান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন—যেখানে আইনের শাসনের প্রশ্ন অনেক সময় রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি দলের ক্ষেত্রে নয়; বরং দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতা, যেখানে ক্ষমতায় থাকা ও বিরোধী অবস্থানের মধ্যে নৈতিক অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ডেভিড বার্গম্যানের মন্তব্যকে কেউ কেউ একপাক্ষিক সমালোচনা হিসেবে দেখলেও, অন্যদিকে অনেকেই এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে তার পর্যবেক্ষণ নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—দেশে আইনের শাসন কতটা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা কতটা সেই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। বার্গম্যানের মন্তব্য সেই প্রশ্নকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে বলে নেটিজেনদের অভিযোগ।
খবরটি শেয়ার করুন