ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
নাটোরের গুরুদাসপুরে চা-কফির দাম বাড়ানোর ঘটনাটি শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ঘিরে তা এখন দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মাইকিং করে চায়ের নতুন দাম ঘোষণা—এমন দৃশ্য অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক লেগেছে, আবার কেউ দেখছেন সময়ের বাস্তবতা হিসেবে।
ভিডিওতে দেখা যায়, এলাকায় মাইকিং করে চায়ের দোকানিরা নতুন মূল্যতালিকা ঘোষণা করছেন। জানানো হচ্ছে—প্রতি কাপ রং চা ৮ টাকা, ব্ল্যাক কফি ১০ টাকা এবং দুধ চা ও দুধ কফি ২০ টাকা। পাশাপাশি পানের দামও বাড়ানো হয়েছে। দোকানগুলোতে নতুন মূল্যতালিকা টাঙিয়েও দেওয়া হয়েছে। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
অনেকেই বিষয়টিকে শ্রমজীবী মানুষের ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে দেখছেন। একজন মন্তব্য করেন, “যেখানে আয় বাড়েনি, সেখানে চায়ের মতো নিত্যসঙ্গী জিনিসের দাম বাড়া মানে গরিব মানুষের ছোট সুখটাও কেড়ে নেওয়া।” আরেকজন লিখেছেন, “এক কাপ চা ছিল গরিবের ‘রিফ্রেশমেন্ট’, এখন সেটাও বিলাসিতা হয়ে যাচ্ছে।”
তবে অন্য একটি অংশ দোকানিদের পক্ষেও কথা বলছেন। তাদের যুক্তি, বাজারে সব কিছুর দাম বাড়ছে, সেখানে চা-দোকানিরা আগের দামে বিক্রি করে টিকে থাকতে পারবেন না। একজন নেটিজেন লিখেছেন, “গ্যাস, চিনি, দুধ—সবকিছুর দাম বেড়েছে। চায়ের দাম না বাড়িয়ে দোকানিরা কীভাবে চলবেন?”
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, গত শুক্রবার গুরুদাসপুর পৌরসভাসহ আশপাশের অন্তত ৪০ জন চায়ের দোকানি এক বৈঠকে বসে সর্বসম্মতিক্রমে নতুন মূল্য নির্ধারণ করেন। পরে ‘চা-ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি’ নামে একটি সংগঠনও গঠন করা হয়, যাতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও নিজেদের অধিকার রক্ষা করা যায়।
দোকানিদের দাবি, গ্যাস, পেট্রল, কেরোসিন, চিনি, চা-পাতা, দুধ, বিদ্যুৎ বিল ও দোকান ভাড়া—সব কিছুর দাম বেড়েছে। ফলে চায়ের দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
অন্যদিকে এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমজীবী মানুষের ওপর। ভ্যানচালক বাটুল মিয়া জানান, তিনি প্রতিদিন ২০০ টাকা ভাড়ায় ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালান। আগে দিনে ৪ থেকে ৬ কাপ চা, সঙ্গে বিস্কুট ও পান খেতেন। এতে দিনে ৫০ থেকে ৬০ টাকা খরচ হতো। এখন সেই খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। তার মতো আরও অনেকেই বলছেন, সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে চায়ের খরচ কমানো ছাড়া উপায় নেই।
চাঁচকৈড় বাজারের চা-দোকানি শুকুমার হালদার বলেন, আগে যে গ্যাস সিলিন্ডার ১ হাজার ৪০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। একইভাবে চিনি, চা-পাতা ও দুধের দামও বেড়েছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
চা ও পান বিক্রেতা শামীম হোসেন জানান, দাম বাড়ানোর পর কিছুটা বিক্রি কমেছে। তবে তিনি মনে করেন, চা-পানের অভ্যাসের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
ভিডিওটি নিয়ে নেটিজেনদের আরেকটি আলোচনার জায়গা হচ্ছে—মাইকিং করে দাম বাড়ানোর বিষয়টি। কেউ কেউ এটিকে “সমন্বিত সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা” হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, “এটা এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট।”
রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মাজেম আলী মলিন মনে করেন, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে খরচে সংযমী হতে হবে।
সব মিলিয়ে, এক কাপ চা—যা ছিল শ্রমজীবী মানুষের সামান্য স্বস্তির প্রতীক—তা নিয়েই এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছে, বিষয়টি শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়; এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক চাপেরই প্রতিফলন।
খবরটি শেয়ার করুন