ফাইল ছবি
ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ কিংবা লিবিয়ার মরুভূমির নিষ্ঠুর বাস্তবতা—কোনোটাই থামাতে পারছে না উন্নত জীবনের আশায় অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রার চেষ্টা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক নৌকাডুবি, অপহরণ, নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।
বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার পথে বছরে অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি প্রাণ হারাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার গ্রিস উপকূলে নৌকাডুবিতে ১৮ থেকে ২০ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যম জানিয়েছে। একই ঘটনায় অন্তত ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সাগরপথে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভয়াবহ ঝুঁকির চিত্র।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির পর ২৩ জনের অর্ধগলিত মরদেহ লিবিয়ার পূর্ব উপকূলে ভেসে আসে। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় তাদের সেখানেই দাফন করা হয়। মৃতদের অবয়ব ও পোশাক দেখে তাদের বাংলাদেশি বলে ধারণা করা হয়। ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিউনিসিয়া উপকূলে আরেকটি নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান ৮ বাংলাদেশি।
শুধু সাম্প্রতিক সময় নয়, গত কয়েক বছর ধরেই এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হওয়া ৩০ জনের কোনো খোঁজ আজও মেলেনি। একই বছরের আগস্টে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন নরসিংদীর বেলাব উপজেলার ৯ তরুণ। জুন মাসে আরেকটি ঘটনায় একজন নিহত এবং ১৩ জন নিখোঁজ হন।
২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়েও একাধিক নৌকাডুবিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২০২১ সালের জুনে বাংলাদেশ, মিসরসহ চার দেশের অন্তত ৪৩ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা যান।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বলছে, সাগরপথে ঝুঁকি নেওয়া মানুষের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নৌকাডুবির ঘটনাও।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানায়, প্রতিবছর লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে অন্তত ৫০০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। গত এক দশকে ভূমধ্যসাগরে প্রায় ৩০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি।
আইওএম জানিয়েছে, গত ১০ দিনেই কয়েকটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে, যাতে কয়েক শ মানুষের প্রাণহানি হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে ইউরোপে যাওয়ার পথে বিপদে পড়া ৪৮ হাজার ৫৪৮ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক ২৩৯ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার সময় মারা যাওয়া ১৮৭ জন বাংলাদেশির মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা—এই তিনটি প্রধান কারণ মানুষকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এসব এলাকায় সক্রিয় দালাল চক্র নানা প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে ইউরোপে পাঠানোর ফাঁদে ফেলছে।
সূত্রমতে, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে সাগরপথে পাচার হওয়া অভিবাসীদের তালিকায় শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। এ সময়ে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৭৩৫ জন। তালিকায় এরপর ছিল ইরিত্রিয়া, মিসর, পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, সিরিয়া, সুদান, সোমালিয়া, গিনি ও আলজেরিয়া।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ও মাইগ্রেন্ট ইনফোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ভূমধ্যসাগর হয়ে ৩ হাজার ৩৯৫ জন অবৈধ অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। একই সময়ে প্রায় ৬৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই রুট দিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী যান ইতালি ও গ্রিসে।
অবৈধ এই যাত্রার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা দালাল ও মানব পাচারকারী চক্রের। বড় কোনো দুর্ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও তা স্থায়ী হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ৪ হাজার ৪৪৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিচারাধীন ৩ হাজার ৩৪টি এবং তদন্তাধীন ১ হাজার ৪৪৬টি। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৭৮।
২০২৪ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ২৯১টি এবং আসামি ছিলেন ১৬ হাজার ৪৩২ জন। তবে এত মামলা থাকা সত্ত্বেও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমেনি।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, দেশের ৮ থেকে ১০টি জেলা থেকে মূলত এই মানব পাচারের ঘটনা ঘটে। ঝুঁকি জেনেও মানুষ এই পথ বেছে নিচ্ছে। তাঁদের সচেতন করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সারাবছর সক্রিয় থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবে বড় কোনো ঘটনা ঘটলেই শুধু তৎপরতা দেখা যায়।
মানব পাচারের মামলাগুলোর বড় অংশের তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. বদরুল আলম মোল্লা জানান, বর্তমানে সিআইডিতে মানব পাচারের ৯১টি মামলার তদন্ত চলছে। লিবিয়ায় নির্যাতন ও হত্যাসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোরও তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালানো জরুরি। তা না হলে ভূমধ্যসাগরের এই মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন হবে।
উন্নত জীবনের স্বপ্ন অনেকের জন্যই এখনো অটুট। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে মৃত্যুঝুঁকি যেন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে—যা দেশের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন