ছবি: সংগৃহীত
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও রোগ নির্ণয়ের জন্য এখনো ঢাকার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে অধিকাংশ জেলাকে। ফলে ঢাকার বাইরে সন্দেহভাজন রোগীদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেটসহ দেশের বেশির ভাগ বিভাগীয় শহর ও জেলায় এখনো হামের নমুনা পরীক্ষার কোনো কার্যকর ল্যাব সুবিধা গড়ে ওঠেনি। ফলে রোগ শনাক্তে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাতে হয়, আর ফল পেতে অপেক্ষা করতে হয় প্রায় এক সপ্তাহ। এই সময়টাতে চিকিৎসকেরা নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করতে না পারায় পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হচ্ছে।
পরীক্ষার অভাবে চিকিৎসায় বিলম্ব
সিলেটের সিভিল সার্জন মো. নাসির উদ্দিন মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, হামের নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দিলে রোগীর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়। ফল পেতে অন্তত সাত দিন সময় লাগে। এ সময় রোগীদের আইসোলেশনে রেখে পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়। তবে চূড়ান্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত রাখতে হয়।
সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ও এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে একাধিক শিশু ভর্তি রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষার আগেই রোগীরা সুস্থ হয়ে যায় বা অন্যত্র চলে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)-এর সাবেক এক বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হাম সন্দেহ হলেই দ্রুত ল্যাব কনফার্মেশন জরুরি। কিন্তু সাত দিন অপেক্ষা করলে রোগী যেমন ঝুঁকিতে থাকে, তেমনি কমিউনিটিতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।”
টিকা পাওয়ার আগেই আক্রান্ত শিশু
যশোরের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সেখানে হামে আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশের বয়স ৯ মাসের কম। অথচ জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে।
যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ৮৯টি নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হলে ২১টি পজিটিভ আসে। আক্রান্তদের মধ্যে ১৭ জনই ৯ মাসের কম বয়সী শিশু।
যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল সুখবর ডটকমকে বলেন, “অনেক শিশু টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে কিছু প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলেও তা সব ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। আবার অনেক মা নিজেরাও পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত না হওয়ায় নবজাতকের ঝুঁকি বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “এটি ইঙ্গিত দেয় যে কমিউনিটিতে ভাইরাসের সার্কুলেশন বেড়েছে। টিকাদানের কভারেজ যদি সামান্য কমেও যায়, তখনই এই ধরনের আউটব্রেক দেখা দেয়।”
বিভিন্ন জেলায় বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা
কুমিল্লায় হামে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ১৫ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৮ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে ২৫ শিশু ভর্তি হয়, যাদের মধ্যে কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে।
মৌলভীবাজারে ২২ জন রোগী হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন, যার মধ্যে ৯ জনের পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে ৪০টি নমুনার মধ্যে দুজন শিশুর শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। যদিও সেখানে এখনো কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
নওগাঁয় পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। সেখানে হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে একই বিছানায় দুই থেকে তিনজন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আবু জার গাফফার মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, “জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রয়োজন হলে আইসোলেশন সুবিধা বাড়ানো হবে।”
ময়মনসিংহে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত দুই সপ্তাহে ১০৮ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৬৮ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করেছে। সহকারী পরিচালক ডা. মুহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান সুখবর ডটকমকে বলেন, “রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শিশু ওয়ার্ডে জায়গা হচ্ছে না। তাই নতুন ভবনে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।”
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রতিটি উপজেলায় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা সার্বক্ষণিক রোগীদের চিকিৎসা তদারকি করছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: কাঠামোগত দুর্বলতা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ঢাকাকেন্দ্রিক ল্যাব সুবিধা, পর্যাপ্ত আইসোলেশন ওয়ার্ডের অভাব এবং জনবল সংকট পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
একজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, “বাংলাদেশে হাম নির্মূলের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে আমরা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। এর অন্যতম কারণ হলো দ্রুত রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অন্তত একটি করে আধুনিক ভাইরোলজি ল্যাব থাকা জরুরি, যেখানে দ্রুত হামের পরীক্ষা করা যাবে।”
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন—বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে দ্রুত ল্যাব সুবিধা চালু করা, টিকাদান কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো, হাসপাতালগুলোতে আলাদা আইসোলেশন ইউনিট বৃদ্ধি, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের সুরক্ষায় পরিবারের সদস্যদের টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরুত্থান বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ঢাকার বাইরে পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা শুধু চিকিৎসায় বিলম্বই ঘটাচ্ছে না, বরং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকেও কঠিন করে তুলছে। দ্রুত বিকেন্দ্রীকরণ, টিকাদান জোরদার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন