ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, যোগ্যতা ও পেশাদারত্বকে নিয়োগের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম আলোচিত অঙ্গীকার। কিন্তু সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ ১২টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বিএনপির নেতা ও সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় সেই অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই) প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর ছাপা সংস্করণে "১২ ইনস্টিটিউশনস: গভর্নমেন্ট ভায়োলেটস পোলস প্লেজ উইথ বিএনপি অ্যাপয়েন্টমেন্টস" শিরোনামে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়সহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দেওয়া এসব নিয়োগ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিষয়টি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পালন করবে নির্বাচন কমিশন। ফলে কমিশনের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে কোনো ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি হলে তার প্রভাব নির্বাচনী পরিবেশের ওপরও পড়তে পারে বলে মনে করছে নির্বাচন বিশ্লেষকদের একটি অংশ।
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ বন্ধ করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল—রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়; সততা, যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতা, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতাই হবে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যাশা থেকেই এই অঙ্গীকারকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন।
কিন্তু ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৩ জুলাই সরকার ১১টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা বা সাবেক নেতাদের এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয়। একই দিনে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদেও নিয়োগ দেওয়া হয় বিএনপির একটি কমিটির সাবেক সদস্য হিসেবে পরিচিত একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে। সব মিলিয়ে ১২টি নিয়োগই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া শামসুল আলম নির্বাচন কমিশনেরই সাবেক উপসচিব। তিনি ২০১৭ সালে অবসরে যান। পরে ২০২৫ সালে বিএনপি সংসদীয় আসন পুনর্নির্ধারণ পর্যালোচনার জন্য যে কমিটি গঠন করেছিল, তার সদস্য ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচনী তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
তবে ডেইলি স্টারকে দেওয়া বক্তব্যে শামসুল আলম দাবি করেছেন, তার নিয়োগ রাজনৈতিক নয়। তার ভাষায়, একই দিনে দেওয়া ১২টি নিয়োগের মধ্যে ১১টি রাজনৈতিক হলেও তার নিয়োগ প্রশাসনিক প্রয়োজন থেকেই হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে কমিশনের কোনো ভূমিকা নেই; এটি সরকারের এখতিয়ার। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসুদ বলেছেন, কর্মকর্তাদের নিয়োগ সরকারই দেয়। কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদও বলেছেন, নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তিনি অবগত নন এবং সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া একজন কর্মকর্তার রাজনৈতিক অতীত তার বিবেচ্য বিষয় নয়।
তবে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য মো. আবদুল আলীমের বক্তব্য ভিন্ন। তার মতে, যদি সরকার কমিশনের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে তিনি দ্রুত একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন সার্ভিস গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অন্যতম সুপারিশ ছিল নির্বাচন কমিশনের সচিব কমিশনের নিজস্ব ক্যাডার বা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেওয়া এবং একটি পৃথক নির্বাচন কমিশন সার্ভিস গড়ে তোলা। সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের আগেই বাইরে থেকে রাজনৈতিক পরিচিতিসম্পন্ন ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়াকে অনেকেই সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্যও গুরুড়ত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, এসব নিয়োগ ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। তার মতে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে যেভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা অতীতের বিজয়ী দলের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইফতেখারুজ্জামান আরও মন্তব্য করেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার হিসেবে বিএনপি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার যে প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছিল, বাস্তবে এসব নিয়োগ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার ভাষায়, দীর্ঘদিনের জবাবদিহিহীন শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে যদি নতুন সরকারও একই ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগের পথ অনুসরণ করে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকার অবশ্য এসব নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেছেন, সব নিয়োগই যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে এবং এতে কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এসব নিয়োগের সামঞ্জস্য নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে তিনি তখন রাজি হননি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা এবং নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জাহেদ উর রহমান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জাবিহুল্লাহর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
১১টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি, বিভাগীয় সাংগঠনিক কাঠামো বা সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ জুট করপোরেশন, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পদ, উন্নয়ন প্রকল্প ও জনসেবা পরিচালিত হয়।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেছেন, অভিজ্ঞ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নতুন দায়িত্বে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন। তবে সংশ্লিষ্ট খাতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা না থাকলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তার মতে, প্রয়োজন হলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, জনস্বার্থ, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সরকারের সময়ই প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কিংবা সাংবিধানিক সংস্থায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। ফলে বর্তমান বিতর্ককে অনেকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যে দল অতীতের এই সংস্কৃতির সমালোচনা করে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের ক্ষেত্রে জনসাধারণের প্রত্যাশার মানদণ্ডও স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে।
এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। যদি সরকার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক বাছাই এবং স্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড তুলে ধরতে পারে, তাহলে বিতর্ক কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঘিরে প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব না এলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে শুধু আইন নয়, নিয়োগপ্রক্রিয়াতেও দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ কোনো নিয়োগ আইনগতভাবে বৈধ হলেও যদি জনমনে পক্ষপাতের ধারণা তৈরি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের মতো সংবিধানসম্মত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও সংবেদনশীল। তাই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং জনআস্থার ভারসাম্য রক্ষা—এই তিনটি বিষয়ই এখন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন