ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের পাশের আসনে বসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে নতুন আসনবিন্যাসে এ পরিবর্তন দেখা যায়। এরপর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে, সালাহউদ্দিন আহমদ কি সংসদের উপনেতা হতে যাচ্ছেন?
তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বিএনপির নেতারাও বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসন পাওয়া মানে সংসদের উপনেতা হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে—এমনটি মনে করার সুযোগ নেই। উপনেতা কে হবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
তারপরও সংসদের নতুন আসনবিন্যাসকে ঘিরে আলোচনা থামছে না। কারণ, এত দিন প্রধানমন্ত্রীর ঠিক পাশের আসনে বসতেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন। একই সঙ্গে তার সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য হয়েছে। ফলে সংসদে তার আগের আসনটিও খালি হয়। নতুন আসনবিন্যাসে সেই জায়গায় বসানো হয়েছে সালাহউদ্দিন আহমদকে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতেই নতুন আসনবিন্যাস অনুযায়ী সরকারি দলের সদস্যরা নিজেদের আসনে বসেন। তখনই প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে সালাহউদ্দিন আহমদকে দেখা যায়। সরকারি দলের প্রথম সারিতেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আগের আসনবিন্যাসে প্রথম সারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরের আসনে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার পরের আসনে বসতেন সালাহউদ্দিন আহমদ। নতুন বিন্যাসে সালাহউদ্দিন উঠে এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে। তার পরের আসনে রয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এরপর প্রথম সারিতে রয়েছেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান ও আমানউল্লাহ আমান। আসনবিন্যাসের এই পরিবর্তনে পেছনের সারি থেকে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও সামনে এসেছেন।
সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে বসানোর বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর একটি কারণ তার বর্তমান সরকারি ও দলীয় অবস্থান। তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। একই সঙ্গে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার গুরুত্ব বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিএনপির মহাসচিব পদ নিয়ে আলোচনা। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দলটির মহাসচিব পদ শূন্য হয়েছে। এই পদে কে আসবেন, তা নিয়ে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্যদের মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ ও রুহুল কবির রিজভীর নাম বারবার সামনে এসেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এ দুই নেতাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দলীয় মহাসচিব পদ এবং সংসদের উপনেতার পদ—দুটি আলাদা বিষয়। একটি দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যটি সংসদীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ পদ। তাই সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে বসানোকে একই সঙ্গে দলীয় ও সংসদীয় দায়িত্বের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সংসদের উপনেতা পদটি সরকারদলীয় সংসদীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। সংসদ নেতার সঙ্গে সমন্বয় করে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় এ পদে থাকা ব্যক্তির ভূমিকা থাকে। সংসদ নেতা অনুপস্থিত থাকলে বা তার পক্ষে প্রয়োজন হলে উপনেতা সংসদীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অতীতে ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নেতাদের এই পদে রাখার নজির রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও দীর্ঘ। তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় আন্দোলনের কঠিন সময়েও তিনি আলোচনায় ছিলেন। ২০১০ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের পর তিনি দলের যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। চলতি বছরের নির্বাচনের পর তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। কক্সবাজার জেলা থেকে স্বাধীনতার পর প্রথম পূর্ণ মন্ত্রীও তিনি।
এদিকে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বিএনপির নেতৃত্বের কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে। দলটির স্থায়ী কমিটিতে নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছেন। রুহুল কবির রিজভীও স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছেন। ফলে দলের পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, সেই প্রশ্নও এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
এই পরিস্থিতিতে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটি সালাহউদ্দিন আহমদকে দেওয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সরকার ও সংসদে তার ভূমিকা আরও বাড়ানো হতে পারে। আবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর স্বাভাবিক আসন পুনর্বিন্যাসের কারণেই তাকে ওই জায়গায় বসানো হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সালাহউদ্দিন আহমদকে সংসদের উপনেতা করা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এটি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার এখতিয়ার।
অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত সালাহউদ্দিন আহমদকে সংসদের উপনেতা করার কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে নেই। প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে তাকে বসানো হয়েছে—এটি নিশ্চিত। কিন্তু সেই আসনই উপনেতার পদ পাওয়ার প্রমাণ নয়।
তবে রাজনীতিতে প্রতিটি প্রতীকী পরিবর্তনের আলাদা গুরুত্ব থাকে। বিশেষ করে সংসদের প্রথম সারিতে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটি কেবল বসার জায়গা হিসেবে দেখা হয় না। ওই জায়গায় সাধারণত সরকারের ও দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাই থাকেন। ফলে সালাহউদ্দিন আহমদের নতুন আসন নিয়ে আলোচনা হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।
এখন নজর থাকবে দুটি বিষয়ের দিকে। প্রথমত, বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে কাকে বেছে নেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, সংসদের উপনেতা পদে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুটি সিদ্ধান্ত একই ব্যক্তিকে ঘিরে হলে সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হবে। আর আলাদা সিদ্ধান্ত হলে বোঝা যাবে, সংসদে তার আসন পরিবর্তনটি মূলত রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর মির্জা ফখরুলের আসন শূন্য হওয়ার কারণেই করা হয়েছিল।
তাই আপাতত বলা যায়, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটি সালাহউদ্দিন আহমদের গুরুত্বের একটি দৃশ্যমান ইঙ্গিত। কিন্তু তাকে সংসদের উপনেতা করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
খবরটি শেয়ার করুন