বুধবার, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের চিঠি *** মানিক পশারীর জানাজা-দাফনে বাধার অভিযোগ তদন্তে জামায়াতের কমিটি *** তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা জাপান প্রধানমন্ত্রীর *** রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার: জাতিসংঘের প্রতিবেদন *** মাও সেতুংকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে, দুঃখ প্রকাশ লা লিগার *** আইজিপির বক্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর: রিজভী *** বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমকে সমর্থন করে না সরকার: তথ্য উপদেষ্টা *** ‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে মবের শিকার হবেন না: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা *** আওয়ামী লীগের যারা ভালো মানুষ, তারা আপন ঠিকানা খুঁজে নেবেন: জামায়াত আমির

হাত ফসকে ট্রেনের নিচে শিশু, জীবন বাজি রেখে সন্তানের ওপর শুয়ে বাঁচালেন বাবা

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ০১:১৫ পূর্বাহ্ন, ২৯শে এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে মঙ্গলবার দুপুরের একটি ঘটনা মুহূর্তেই শিহরণ ছড়িয়ে দেয় উপস্থিত মানুষের মধ্যে। ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম, যাত্রীদের ছোটাছুটি, ট্রেনে ওঠার তাড়াহুড়া—এই সবকিছুর মাঝেই ঘটে যেতে পারত এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এক বাবার অবিশ্বাস্য উপস্থিত বুদ্ধি আর আত্মত্যাগে রক্ষা পায় দুই বছরের এক শিশু।

ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার দুপুরে ভৈরব স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে ছেড়ে আসা তিতাস কমিউটার ট্রেনে করে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে স্টেশনে এসেছিলেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার এক দম্পতি। তাদের সঙ্গে ছিল দুই বছর বয়সী সন্তান।

প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে সূত্র স্থানীয় সাংবাদিকদের জানায়, নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বে স্টেশনে পৌঁছায় তিতাস কমিউটার ট্রেনটি। ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে থামার পর যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। ওই দম্পতি কেবিন কার্যালয়ের কাছাকাছি একটি কামরায় ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাড়াহুড়ার মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে মা ও শিশু দুজনই হঠাৎ ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে পড়ে যান।

প্ল্যাটফর্মটি তুলনামূলকভাবে উঁচু হওয়ায় পড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। মা মরিয়া হয়ে শিশুকে বুকে চেপে ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা করেন। কয়েকবার চেষ্টা করে তিনি নিজে প্ল্যাটফর্মে উঠতে সক্ষম হলেও শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে উঠতে পারেননি। এ সময় শিশুটি আবারও হাত ফসকে নিচে পড়ে যায়, ঠিক ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে।

এর মধ্যেই স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বেজে ওঠে। চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বুঝে শিশুটির বাবা প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে ঝাঁপ দেন। কোনো সময় নষ্ট না করে তিনি শিশুটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ট্র্যাকের ওপর শুয়ে পড়েন। ঠিক তখনই ট্রেনটি চলতে শুরু করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুরো সময়টাতে বাবা একবারের জন্যও নড়াচড়া করেননি। ট্রেনটি ধীরে ধীরে তাদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে যায়। উপস্থিত মানুষজন নিঃশ্বাস বন্ধ করে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। কেউ কেউ ‘আল্লাহ, আল্লাহ’ বলে চিৎকার করছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অনেকেই চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন।

কিছুক্ষণ পর যখন ট্রেনটি পুরোপুরি চলে যায়, তখন দেখা যায়—বাবা ও শিশু দুজনই অক্ষত। বাবা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান এবং শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। পরে শিশুটির মা নিচে নেমে এসে তাকে নিজের কোলে নেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের মধ্যে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে।

ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, “তিতাস কমিউটার ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে সেদিন ট্রেনটি প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বে আসে। প্ল্যাটফর্মে ভিড় ছিল, আর সেই ভিড়ের মধ্যেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।”

প্রত্যক্ষদর্শী তিতাস ট্রেনের টিকিট বিক্রেতা ফালু মিয়া সুখবর ডটকমকে বলেন, “ট্রেন চলে যাওয়ার পর আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি, শিশুটিকে তার বাবা কোলবালিশের মতো জড়িয়ে শুয়ে ছিলেন। একটু নড়লেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। আমি জীবনে এমন দৃশ্য দেখিনি।”

ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য দম্পতিকে ভৈরব রেলওয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, “আমরা তাদের হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরে তারা নিজেরাই বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।”

পুলিশ জানায়, দম্পতি তাদের বাড়ি কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের লোহাজুড়ি গ্রামে বলে জানিয়েছেন। তবে তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।

এদিকে, ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রেন চলাকালে বাবা তার শিশুকে জড়িয়ে ধরে সম্পূর্ণ স্থির হয়ে শুয়ে আছেন। চারপাশে আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। ট্রেন চলে যাওয়ার পর তারা অক্ষত অবস্থায় উঠে আসেন।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বাবার সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ কেউ রেলস্টেশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাশেদ মাহমুদ নামে একজন লিখেছেন, “এই বাবার মতো সাহসী মানুষ খুব কমই আছে। নিজের জীবন বাজি রেখে সন্তানকে বাঁচিয়েছেন—এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”

নাজমা আক্তার নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, “ভিডিওটা দেখে গা শিউরে উঠেছে। আল্লাহ না চাইলে এভাবে বাঁচা সম্ভব না। তবে রেলস্টেশনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা উচিত।”

তানভীর হাসান নামে একজন লেখেন, “এটা শুধু একজন বাবার ভালোবাসা নয়, এটা দায়িত্ববোধের চরম উদাহরণ। তবে যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে—চলন্ত বা থামা ট্রেনে ওঠার সময় সতর্ক থাকা জরুরি।”

আবার কেউ কেউ রেল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার দিকেও আঙুল তুলেছেন। ফারহানা ইসলাম নামে একজন মন্তব্য করেন, “প্ল্যাটফর্ম আর ট্রেনের মাঝের ফাঁকা জায়গা এত বিপজ্জনক কেন? এটা কি কমানো যায় না?”

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত অসতর্কতার কারণে নয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণেও ঘটে থাকে। বিশেষ করে ব্যস্ত স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা সমন্বয় এবং যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

রেলওয়ে সূত্র বলছে, প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের ফাঁকা জায়গা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্ধারণ করা হলেও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে অনেক জায়গায় তা ঠিকভাবে বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

অনেকে বলছেন, ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—একটি ছোট অসতর্কতা কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, সংকটময় মুহূর্তে মানুষের উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহস কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভৈরব স্টেশনের ওই দুপুরে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে যা ঘটেছে, তা সহজেই একটি ট্র্যাজেডিতে পরিণত হতে পারত। কিন্তু এক বাবার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সেই সম্ভাব্য ট্র্যাজেডিকে রূপ দিয়েছে এক অলৌকিক রক্ষাকবচে।

ট্রেনের নিচে শিশু

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250