ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত উপস্থাপনা, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় সরলতা ও পরিশীলন দেখছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, লেখক ও গবেষক আনু মুহাম্মদ। তবে তার মতে, ব্যক্তিগত আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তনের কিছু দিক দেখা গেলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত নতুনত্ব এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং আগের সরকারগুলোর অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতাই বজায় রয়েছে।
আজ শনিবার (১ আগস্ট) দৈনিক সমকালের ছাপা সংস্করণে ‘গণঅভ্যুত্থান সমাজের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে’ শিরোনামে প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সমকালের সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুনত্ব এবং গণমুখী রাজনীতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের চলাফেরা, পোশাক, আচার-আচরণ ও কথাবার্তা যথেষ্ট সরল এবং পরিশীলিত। তিনি তার স্ত্রী ও কন্যাকে জনসমক্ষে গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটিও আমি মনে করি প্রশংসাযোগ্য। দেশে স্কুলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ছেলেমেয়ে উভয়ের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক তৎপরতায় উৎসাহ দিচ্ছেন, সেটিও ভালো ঘটনা।’
তবে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক নীতি কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। তার ভাষায়, ‘অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে ঠিক আগের মতোই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার বা এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত অর্থনৈতিক নীতিই বহাল আছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি কিংবা বড় বড় করপোরেট গ্রুপ—যারা বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিচালনা করে, তাদের আধিপত্যই বলবৎ রয়েছে।’
আনু মুহাম্মদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো অপরিবর্তিত থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ আসছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সরকারের পাঁচ মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিজেদেরই কঠোর পর্যালোচনার আওতায় আনা উচিত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্বও অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আনু মুহাম্মদ বলেন, শেখ হাসিনা আমলের যে অর্থনৈতিক নীতিকাঠামোর কারণে লুটপাট, সম্পদ পাচার, বৈষম্য, বেকারত্ব এবং পরিবেশ ধ্বংস ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল, সেই একই কাঠামো বহাল থাকলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করতে এত সময় লাগার কথা নয়। তার মতে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দুই-তিন মাসের মধ্যেই নিহত ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি।
তিনি বলেন, সরকারের হিসাবে নিহতের সংখ্যা আটশর কিছু বেশি, অন্যদিকে জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৪০০। এই পার্থক্যের কারণ তার বোধগম্য নয়। প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অনুসন্ধান চালালেই প্রকৃত তথ্য জানা সম্ভব ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আনু মুহাম্মদ বলেন, ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে এবং রায়ও হচ্ছে। এই বিচার যাতে যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়, সে বিষয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের সময় হওয়া বিভিন্ন চুক্তি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ না করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এই প্রশ্নের জবাব দুই সরকারকেই দিতে হবে।’
বন্দরসংক্রান্ত চুক্তি প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, নতুন সরকারও আগের সরকারের চুক্তির কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। জনগণ প্রত্যাশা করেছিল, শেখ হাসিনার আমলের শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু বাস্তবে সে ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণের দাবি করা সরকারি ও বিরোধী—উভয় রাজনৈতিক দলই তার ভাষায় ‘ভয়াবহ মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে নীরব রয়েছে। নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাদের অবস্থান প্রায় একই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ক্ষমতাসীনদের দায় প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে, দায়ও তাদেরই নিতে হয়। ছায়ানট, উদীচী, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি উসকানিদাতাদেরও বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন।
গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে বলে কিছু মহলের মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো আন্দোলনের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করে তার লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কি না, তার ওপর। তার মতে, গণঅভ্যুত্থানের প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন, আর সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তাই একে ব্যর্থ বলা যায় না। তবে তিনি মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সম্ভাবনা ও জনগণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সেই প্রত্যাশাকে ভিন্ন পথে নিয়ে যাওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা রয়েছে।
আনু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন এবং যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ মঞ্চ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ত্রৈমাসিক সাময়িকী সর্বজনকথা-এর সম্পাদক।
এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক (১৯৮৪–১৯৯৩) এবং তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব (২০০৫–২০২০) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
খবরটি শেয়ার করুন