ফাইল ছবি
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট থমাস ক্রিস্টেনসেন আবারও ভারত সফরে গেছেন। গতকাল ২৭ সেপ্টেম্বর, রোববার বিকেলে তিনি ঢাকা থেকে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। চার মাসের মধ্যে এটি তার তৃতীয় ভারত সফর। সফরের নির্দিষ্ট কর্মসূচি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতের নিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিস্টেনসেনের এবারের দিল্লি সফর এমন সময়ে হয়েছে, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন করে গতি পাওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেছেন। ফলে একই দিনে ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দিল্লি যাত্রাকে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি।
নবভারত টাইমসও একই বিষয় সামনে এনেছে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনের শিরোনামে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, চার মাসে তৃতীয়বার ক্রিস্টেনসেনের দিল্লি সফরের নেপথ্যে কী চলছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন এবং তারেক রহমানের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রিস্টেনসেনের এবারের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নয়াদিল্লিতে তার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা। নিউজ২৪ ও নবভারত টাইমস—দুই সংবাদমাধ্যমই এই সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো বৈঠক হয়েছে কি না, কিংবা হলে সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ হয়নি।
ক্রিস্টেনসেনের ভারত সফরের ধারাবাহিকতাও লক্ষ করার মতো। চলতি বছরের মে মাসে তিনি দিল্লি গিয়েছিলেন। ওই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফরের আগে তার দিল্লি যাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এরপর জুলাইয়ে সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফরের আগে তিনি ভারত সফর করেন। এবার সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আবার দিল্লি গেলেন তিনি।
এর মধ্যে বাংলাদেশের ভেতরেও ক্রিস্টেনসেনের তৎপরতা বেড়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর তিনি সেনা সদর দপ্তরে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় বাংলাদেশের অবদানের বিষয়ও আলোচনায় আসে।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর ক্রিস্টেনসেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বাজারসুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি সেখানে আলোচনায় আসে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ক্রিস্টেনসেনের আলোচনার পরিধি শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, অভিবাসন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়েও তার যোগাযোগ রয়েছে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই তার আবার দিল্লি যাওয়া কূটনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে।
কেউ কেউ বলছেন, ক্রিস্টেনসেনের এবারের সফরকে বুঝতে হলে জুলাইয়ের সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফরের দিকেও তাকাতে হয়। ৩০ জুলাই সার্জিও গোর ঢাকায় আসেন। তিনি তখন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে ছিলেন। সফরের সময় তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেন। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেন।
সেই সফরের একটি বৈঠক বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ৩১ জুলাই ঢাকার একটি হোটেলে সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকের বিষয়ে দুই পক্ষই বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি। ডেইলি সান জানিয়েছিল, দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছে। তবে আলোচনার নির্দিষ্ট বিষয় জানানো হয়নি।
যুগান্তরও ২ আগস্টের প্রতিবেদনে ওই বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা সফরে এসে সার্জিও গোর অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে না বসে শুধু ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করায় কূটনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আঞ্চলিক সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় আনা হয়।
এই বৈঠক নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যও আসে। ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সার্জিও গোর ও দীনেশ ত্রিবেদী যদি সৌজন্য সাক্ষাৎ করে থাকেন, তাহলে বিষয়টি আলাদা। কিন্তু দুই দেশের কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকলে তা বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে হওয়া উচিত ছিল।
এরপর দীনেশ ত্রিবেদীর আরেকটি দিল্লি সফরও আলোচনায় আসে। ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় বৈঠক করেন ত্রিবেদী। ওই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। বৈঠকের পর ত্রিবেদী দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। এনডিটিভি জানিয়েছিল, তিনি দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বৈঠকের বিষয়ে অবহিত করবেন।
১১ আগস্ট দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ত্রিবেদী। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ত্রিবেদী দিল্লিতে গিয়ে মোদির সঙ্গে দেখা করেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে ঢাকার শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকের পর তার এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
৩১ জুলাই সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর ত্রিবেদী কলকাতায় গিয়েছিলেন—এমন খবরও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ প্রকাশ করেছিল। তবে সেটি ব্যক্তিগত কাজে কলকাতা যাত্রা বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আর ১০ আগস্ট তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর তার দিল্লি যাওয়া ছিল আলাদা ঘটনা। ফলে দুটি সফরকে এক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এই ধারাবাহিকতায় ক্রিস্টেনসেনের এবারের দিল্লি সফর নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দুই কূটনীতিকের মধ্যে বাংলাদেশকে ঘিরে যোগাযোগ আগে থেকেই রয়েছে। জুলাইয়ে গোর ঢাকায় এসে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আগস্টে ত্রিবেদী ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে দিল্লিতে গিয়ে মোদির সঙ্গে কথা বলেছেন। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত আবার দিল্লি গেলেন।
এদিকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক বার্তা এসেছে। ২২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক চায়। দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে আলোচনার কথাও তিনি বলেন। ডেইলি স্টার ওই বক্তব্যকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন দিকে নেওয়ার ভারতের আগ্রহ হিসেবে তুলে ধরেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ক্রিস্টেনসেনের দিল্লি সফরকে শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক যাতায়াত হিসেবে দেখছে না ভারতের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। বিশেষ করে চার মাসে তৃতীয় সফর, সার্জিও গোরের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে তা র প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যবিষয়ক যোগাযোগ—এসবকে একসঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে বলা যাচ্ছে না যে ক্রিস্টেনসেনের দিল্লি সফরে বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এমন কোনো বৈঠকের তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি, যেখানে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত কোনো সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
বরং যে চিত্রটি স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো বাংলাদেশকে ঘিরে ঢাকা, দিল্লি ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক যোগাযোগের ঘনত্ব বেড়েছে। একদিকে ঢাকা ও দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, অভিবাসন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে সক্রিয় রয়েছে। আর ভারতও বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের কাঠামো পুনর্গঠনের বার্তা দিচ্ছে।
তাই ক্রিস্টেনসেনের এবারের দিল্লি সফরের আসল গুরুত্ব নির্ভর করবে তিনি সেখানে কার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং কী বিষয়ে আলোচনা করেন তার ওপর। সেই তথ্য প্রকাশ্যে এলে বোঝা যাবে, এটি নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ, নাকি বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বৃহত্তর আঞ্চলিক সমন্বয়ের অংশ। আপাতত ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রশ্নটি সেখানেই—চার মাসে তৃতীয়বার কেন দিল্লি গেলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত, আর এই সফরের পর্দার আড়ালে আসলে কী আলোচনা হচ্ছে?
খবরটি শেয়ার করুন