ফাইল ছবি
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের ঢাকা সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতীয় দুটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম রেডিফ ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে তার ঢাকায় আসার কথা বলা হয়েছে। তবে এই সফর নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বা ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
রেডিফের ১৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, অজিত দোভাল ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি প্রায় দিনের তিন-চতুর্থাংশ সময় ঢাকায় ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তার এই সফর বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে রেডিফ জানায়, দুই দেশের মধ্যে শিগগিরই দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হতে পারে।
তবে রেডিফের ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরও ঢাকার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ্য বক্তব্য ও বিবৃতিতেও অজিত দোভালের ১৭ সেপ্টেম্বরের ঢাকা সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করার তথ্য পাওয়া যায়নি। সুখবর ডটকমের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা দোভালের ঢাকা সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
এর মধ্যে ২৭ সেপ্টেম্বর টাইমস অব ইন্ডিয়া বিষয়টি আবার সামনে আনে। পত্রিকাটি জানায়, ভারত ও বাংলাদেশ নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা করছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, অজিত দোভাল সম্প্রতি ঢাকায় গিয়েছিলেন—এমন খবর কোনো পক্ষই নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। প্রতিবেদনে সফরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বরের কথা উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ, ভারতীয় দুই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। সেটি হলো—১৭ সেপ্টেম্বর অজিত দোভালের ঢাকা সফরের খবর। তবে সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার মতো বক্তব্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে তার সফরটি সত্যিই হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য নেই।
রেডিফের প্রতিবেদনে বলা হয়, দোভালের সফরের সঙ্গে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের প্রস্তুতির সম্পর্ক রয়েছে। এর আগে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারতীয় এই কূটনীতিক ঢাকায় বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন বলে রেডিফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নানা বিষয়ও সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় থাকতে পারে বলে রেডিফ জানিয়েছে। এর মধ্যে সীমান্ত, সীমান্ত দিয়ে মানুষের চলাচল, বাণিজ্য, পানি বণ্টন, জ্বালানি এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় রয়েছে। তবে এসব বিষয় নিয়ে দোভাল ঢাকায় এসে কার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, বৈঠকের স্থান কোথায় ছিল কিংবা কী আলোচনা হয়েছে—এসব বিষয়ে কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
দোভালের ঢাকা সফরের খবর এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ঢাকা ও নয়াদিল্লি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে আবার আলোচনা করছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ১৯ সেপ্টেম্বর জানায়, দুই দেশ নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে আগস্টে তারেক রহমানের ভারত সফরের একটি সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আরও জানায়, বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে আসাদ আলম সিয়ামের দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা-নয়াদিল্লির যোগাযোগ আরও এগোতে পারে। ভারতীয় পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে।
আগস্টে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্য কূটনৈতিক যোগাযোগও হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিও দিয়েছিল। সেখানে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তখন বলা হয়েছিল, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী। পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্কের কথা বলেন।
অজিত দোভালের ঢাকা সফরের খবরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সময়কাল। ১৭ সেপ্টেম্বর তার ঢাকা সফরের কথা বলা হলেও ১৯ সেপ্টেম্বর রেডিফ এবং ২৭ সেপ্টেম্বর টাইমস অব ইন্ডিয়া বিষয়টি প্রকাশ করে। দুই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেই কূটনৈতিক সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সফরের ছবি, সরকারি বৈঠকের তথ্য, সফরসূচি বা দুই সরকারের কোনো যৌথ বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি।
সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত এমন কোনো সরকারি নথি বা প্রকাশ্য বিবৃতি পাওয়া যায়নি, যেখানে বাংলাদেশ সরকার অজিত দোভালের ১৭ সেপ্টেম্বরের ঢাকা সফরের কথা নিশ্চিত করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও সুখবর ডটকমকে সফরটির বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। ফলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যকে এখন পর্যন্ত সূত্রভিত্তিক খবর হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।
এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী দুই মাসের সম্ভাব্য বিদেশ সফরের তালিকাও বড় হচ্ছে। প্রথম আলো ২৭ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, অক্টোবর ও নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী জাপান, তুরস্ক ও সৌদি আরব সফর করতে পারেন। এর মধ্যে জাপান ও সৌদি আরব সফর হবে দ্বিপক্ষীয়। তুরস্কে তিনি জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩১তম সম্মেলনে অংশ নিতে পারেন।
ডেইলি স্টারও ২৮ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, জাপান, তুরস্ক ও সৌদি আরবে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। জাপান ও সৌদি আরব থেকে পৃথক দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ রয়েছে। তুরস্কে আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
এর বাইরে ভারত সফরের আলোচনা যুক্ত হলে অক্টোবর ও নভেম্বর মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চার দেশ সফরের বিষয়টি সামনে আসে। তবে ভারত সফর এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। টাইমস অব ইন্ডিয়া নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের কথা জানিয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে সম্ভাব্য সফরের সময় নিয়ে দুই দেশের আলোচনার কথা জানিয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষ এখনো সফরের তারিখ ঘোষণা করেনি।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে অজিত দোভালের কথিত ঢাকা সফরের যোগসূত্রের কথাই রেডিফ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে। তবে সেটি সরকারি বক্তব্য নয়। বরং সংবাদমাধ্যমটির কূটনৈতিক সূত্রনির্ভর তথ্য।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে তাই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, রেডিফ ১৭ সেপ্টেম্বর অজিত দোভালের ঢাকা সফরের কথা জানিয়েছে। দ্বিতীয়ত, টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই সফরের খবর প্রকাশ করেছে, তবে দুই সরকারের কেউ তা নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি বলে জানিয়েছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ দেয়নি এবং সুখবর ডটকমকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও সফরটি নিশ্চিত করেননি।
ফলে প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে—অজিত দোভাল কি সত্যিই ১৭ সেপ্টেম্বর গোপনে ঢাকায় এসেছিলেন? ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য সেই দাবিকে সামনে এনেছে।
খবরটি শেয়ার করুন