ছবি: সংগৃহীত
সহিংসতা, ইন্টারনেট বন্ধ, বিরোধী আন্দোলনের ওপর দমন-পীড়ন এবং ভোটে অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পাকিস্তান-শাসিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের আইনসভা নির্বাচন। ২৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন ঘিরে অঞ্চলটিতে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। ভোটের আগে ও ভোট চলাকালে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হন। কয়েকটি আসনে ভোট স্থগিত রাখতে হয় এবং কিছু কেন্দ্রে পুনরায় ভোটের আয়োজন করা হয়।
ইউরোপিয়ান টাইমসের ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই অঞ্চলটির বড় অংশে মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে স্থানীয় অধিকার আন্দোলনের অন্যতম বড় সংগঠন জম্মু ও কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি বা জেএএসি-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি অভিযান চালানো হয়। তবে ইউরোপিয়ান টাইমসের কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রয়টার্স জানিয়েছে, জুনের শুরু থেকেই পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বিক্ষোভ তীব্র হতে থাকে। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আইনসভার ১২টি আসন নিয়ে বিরোধ। এসব আসন পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এ ব্যবস্থার কারণে পাকিস্তানের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়াই অঞ্চলটির রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
জেএএসি দীর্ঘদিন ধরে এই ১২ আসন বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে স্থানীয় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, আসনগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত এবং সংবিধান সংশোধন ছাড়া সেগুলো বাতিল করা সম্ভব নয়। এর পরপরই আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বহু মানুষ নিহত হন। সরকারি ও আন্দোলনকারী পক্ষের দেওয়া হতাহতের সংখ্যা এক নয়।
রয়টার্সের ২৯ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাওয়ালাকোটসহ কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষে ৩০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তবে কিছু মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও হতাহত হন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বলেছে, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতেই তারা অভিযান চালিয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ করেছেন।
নির্বাচনের সময় যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকাও বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। আল-জাজিরা জানিয়েছে, ৫ জুন থেকে অঞ্চলটির বড় অংশে মোবাইল ডাটা ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ ছিল। এর ফলে রাজনৈতিক প্রচার, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন কাজ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। অনেক জায়গায় সড়ক অবরোধের কারণে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই নির্বাচন তিন ধাপে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ধাপে ধাপে ভোট নেওয়া প্রয়োজন। প্রথম ধাপে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ বা পিএমএল-এন ১৩টির মধ্যে নয়টি আসনে জয় পায়। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই নির্বাচন বর্জন করে। দলটির অভিযোগ ছিল, নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার পরিবেশ নেই।
ইউরোপিয়ান টাইমস জানিয়েছে, প্রথম দুই ধাপে ভোট পড়েছে যথাক্রমে প্রায় ৪৬ ও ৫৩ শতাংশ। ২০২১ সালের নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ। পুঞ্চ ও সুধনোতির কয়েকটি আসনে ভোট স্থগিত করা হয় এবং বাঘের কিছু কেন্দ্রে পুনরায় ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। পাকিস্তান পিপলস পার্টিও কয়েকটি আসনে অনিয়মের অভিযোগ তোলে।
নির্বাচনের ফলাফলে পিএমএল-এন সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসে, আর পাকিস্তান পিপলস পার্টি দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে। তবে ভোট শেষ হলেও রাজনৈতিক সংকট কাটেনি। সংরক্ষিত ১২ আসন বাতিল, নিহতদের ঘটনার তদন্ত, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
ফলে এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব কতটা কার্যকর, ইসলামাবাদের প্রভাব কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সুযোগ কতটা স্বাধীন—এসব পুরোনো প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন