ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
কুমিল্লায় রাজনৈতিক কর্মসূচির মিছিলে আলোচিত কিশোর গ্যাং নেতা ইমরান হোসেন ওরফে রতনের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এবার মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিনের সঙ্গে তার কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় দুই মিনিটের ওই ভিডিওতে মিছিলে রতনের উপস্থিতি, তাকে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং কর্মসূচিতে তার যাওয়ার কারণ নিয়ে দুজনকে কথা বলতে শোনা যায়।
গত বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লেও বৃহস্পতিবারও এটি নিয়ে আলোচনা ছিল। ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সুখবর ডটকম। তবে ভিডিওতে যে কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে, সেটি মহসিন ও রতনের বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। মহসিনও সুখবর ডটকমকে বলেছেন, শনিবার ইমরান নামে একজন তাকে ফোন করে ওই কথোপকথন করেছিলেন।
ভিডিওটিতে রতনের মুখ দেখা যায় না। তিনি মুঠোফোনে কথা বলার সময় পাশে থাকা একজনকে দিয়ে কথোপকথনের দৃশ্য ধারণ করিয়েছেন বলে ভিডিওটি দেখে বোঝা যায়। তার আশপাশে অন্য একজন তরুণীর কণ্ঠও শোনা যায়।
কথোপকথনে রতন মূলত মিছিলের কর্মসূচিতে কেন গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে মহসিনের বক্তব্য জানতে চান। তিনি মহসিনকে বলেন, সংবাদমাধ্যমে তাকে কিশোর গ্যাংয়ের নেতা, অস্ত্রধারী ও হত্যা মামলার আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। মিছিলে তিনি কোনো অস্ত্র প্রদর্শন বা অপরাধ করেননি—এমন কথাও তাকে বলতে শোনা যায়।
জবাবে মহসিন বলেন, সাংবাদিকেরা তাকে ফোন করে মিছিলে রতনের উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, মিছিলটি ছিল বড় পরিসরের এবং সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ ছিল। মিছিলের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তার ছিল; সেখানে কে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত, কে অপরাধে জড়িত—তা তার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি।
একপর্যায়ে রতন মহসিনকে প্রশ্ন করেন, তিনি কোন কর্মসূচিতে এসেছিলেন। তখন ‘রুবেল ভাইয়ের প্রোগ্রাম’ কথাটি একাধিকবার উঠে আসে। রতনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি নিজেকে ওই কর্মসূচিতে রুবেলের সঙ্গে আসা ব্যক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন। মহসিন তাকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখতে বলেন এবং সেখানে তার নিজের বক্তব্য কী ছিল, সেটি শুনতে বলেন।
এই ফোনালাপ প্রকাশের আগে থেকেই মিছিল নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা মহানগর ও দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণে একটি বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলের সামনে ছিলেন মহসিন। তার পেছনে রতনকে দেখা যায়। ২৫ সেপ্টেম্বর ওই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে মহসিন বলেন, মিছিলে হাজারো নেতা-কর্মীর ভিড়ে রতন কীভাবে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা তিনি জানতেন না। রতনের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথাও অস্বীকার করেন। তিনি আরও দাবি করেন, রতনকে আগে থেকে চেনেন না।
কিন্তু এর মধ্যেই রতনের পক্ষ থেকেও পাল্টা বক্তব্য আসে। ‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, রতন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, মহসিন তাকে ফোন করে মিছিলে নিয়েছিলেন। পরে মহসিন তার সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মহসিন ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে রতনকে কললিস্ট দেখানোর আহ্বান জানান। ফলে মিছিলে রতনের উপস্থিতি কীভাবে ঘটল, সেটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি হয়েছে।
এবার প্রকাশিত ফোনালাপ সেই বিরোধকে আরও আলোচনায় এনেছে। কারণ, ভিডিওতে দুজনের মধ্যে মিছিল এবং রতনকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে সরাসরি কথাবার্তা হতে শোনা যাচ্ছে। তবে শুধু এই কথোপকথন থেকেই মহসিন রতনকে মিছিলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে কোনো কললিস্ট বা স্বাধীন প্রযুক্তিগত যাচাইও প্রকাশ্যে আসেনি।
ফোনালাপে যে ‘রুবেল’-এর কথা এসেছে, তিনি কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক সেলিম ওরফে রুবেল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সুখবর ডটকমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার সময় রুবেল বলেন, তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি বড় কর্মসূচিতে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। মহসিনও তার আমন্ত্রণে সেখানে গিয়েছিলেন। তবে রতন কার সঙ্গে বা কীভাবে মিছিলে যুক্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেন।
রুবেলের ভাষ্য, কর্মসূচিতে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। মহসিনকে তিনি মিছিলের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের কথা বলেছিলেন। তার দাবি, তিনি কিশোর বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত করার পক্ষে নন। মিছিলে রতনের উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি আগে থেকে কিছু জানতেন না।
মহসিনও সুখবর ডটকমকে বলেন, ‘ইমরান’ নামে একজন শনিবার তাকে ফোন করেছিলেন। সেই ফোনালাপই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। তার দাবি, ওই কথোপকথনে তিনি রতনকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আসার আমন্ত্রণ দিয়েছেন—এমন কোনো বক্তব্য নেই। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
রতনকে নিয়ে কুমিল্লায় বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে নগরের কিশোর গ্যাং–সংক্রান্ত ৩২টি ঘটনা ও অভিযানের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’সহ একাধিক দলের নাম এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রতন গ্রুপের প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতন ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং পরে জামিনে এলাকায় ফেরেন। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে ধরতে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে।
এ ঘটনার সময়ও কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী পুলিশের অভিযান চলছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের মধ্যে ৪৫১ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয় এবং অন্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর রাতেও ১৮ থানায় অভিযান চালানো হয়। পুলিশ ২৫৪ জনকে আটক করে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রতন গ্রুপের চারজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাদের একজন আনিসুর রহমান ওরফে আনিককে পুলিশ রতন গ্রুপের ‘দ্বিতীয় প্রধান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার সুখবর ডটকমকে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নতুন ভিডিওটির বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখবেন। যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নাহিদুজ্জামান রানাও বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে পর্যালোচনার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অবস্থান তাদের সংগঠনের ঘোষিত অবস্থানের অংশ। প্রথম ভিডিও প্রকাশের পর নতুন কথোপকথনের ভিডিওটিও তাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি যাচাই করে কেন্দ্রীয় নেতাদের জানানো হবে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন দুটি—মিছিলে রতন কীভাবে ঢুকেছিলেন এবং মহসিনের সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রকৃতি কী ছিল। প্রথম প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মহসিন, রুবেল ও রতনের বক্তব্য এক নয়। দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে নতুন ভিডিওতে দুজনের কথাবার্তার প্রমাণ মিললেও, কথোপকথনের পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং ফোনকলের উদ্যোগ কে নিয়েছিলেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা মন্তব্যও দেখা যাচ্ছে। তবে এসব মন্তব্যের বেশির ভাগই ব্যক্তিগত মতামত; এগুলোকে ঘটনার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অপরাধে অভিযুক্ত বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কুমিল্লার নাগরিক সমাজেও। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চলার সময়ে এমন একটি ব্যক্তির রাজনৈতিক মিছিলে দৃশ্যমান উপস্থিতি দলীয় কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা ও অংশগ্রহণকারীদের যাচাই নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
খবরটি শেয়ার করুন