বুধবার, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের চিঠি *** মানিক পশারীর জানাজা-দাফনে বাধার অভিযোগ তদন্তে জামায়াতের কমিটি *** তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা জাপান প্রধানমন্ত্রীর *** রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার: জাতিসংঘের প্রতিবেদন *** মাও সেতুংকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে, দুঃখ প্রকাশ লা লিগার *** আইজিপির বক্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর: রিজভী *** বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমকে সমর্থন করে না সরকার: তথ্য উপদেষ্টা *** ‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে মবের শিকার হবেন না: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা *** আওয়ামী লীগের যারা ভালো মানুষ, তারা আপন ঠিকানা খুঁজে নেবেন: জামায়াত আমির

‘খায়রুল হককে মিথ্যাভাবে জুলাই হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে’

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০৫:৫৯ অপরাহ্ন, ২২শে এপ্রিল ২০২৬

#

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেছেন, এই কমিশনের কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অভাব ছিল এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল নির্বাচিত নয়, বরং সীমিত পরিসরে পরিচালিত।

সম্প্রতি একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সারা হোসেন বলেন, ‘সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায় না। এটা সিলেক্টিভ প্রসেস। কয়েকজনকে নিয়ে আপনারা বসে ডিসিশন নিয়েছেন। গণতন্ত্র এখানে কোথায় ছিল? কিসের নির্বাচন, কে এসছে? বাইরে থেকে কে কথা বলতে পেরেছে? কেউ না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনে একজনও নারী সদস্য ছিলেন না। বিচারব্যবস্থা সংস্কার কমিশনেও কোনো নারী আইনজীবী কিংবা বিচারপতিকে সম্পৃক্ত করা হয়নি।’ তার মতে, এই অনুপস্থিতি শুধু প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে একপাক্ষিক করে তুলেছে।

গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। বিশেষ করে গণভোটের তৃতীয় প্রশ্ন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আপনারা হাত তুলে আমাকে বলেন, কয়জন বলতে পারবেন ৩০টা প্রস্তাব কী ছিল?...আপনারা কিসের জন্য ভোট দিয়েছেন, সেটা আপনারা জানেন বলে আমার মনে হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা একটা বড় প্রশ্ন, আপনি ভোট দিচ্ছেন, কিসের জন্য দিচ্ছেন?...হ্যাঁ/না—এটা জানি। কিন্তু কিসের জন্য ভোট দিচ্ছি, এটা আমি যদি না জানি, তাহলে ভোটের কত দূর মূল্য আছে?’ তার এই মন্তব্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সচেতন অংশগ্রহণের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন সারা হোসেন। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী আমলে প্রণীত এই দুটি আইন পুনর্বহাল হওয়া উচিত। যদিও তিনি গণভোটের প্রশ্ন ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তবুও গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘সবাই ইতিবাচক পরিবর্তন চাইছে। নির্বাহী বিভাগে যারা আছেন, তারা বিচার বিভাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করার জন্য ব্যবহার করবেন—এমনটা কেউ চান না। এই মৌলিক পরিবর্তনের জন্যই আইন দুটি প্রয়োজন ছিল।’

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিচারপ্রার্থীরা যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচার পেতে পারেন। যাদের প্রতিপক্ষ বলে মনে করা হচ্ছে, তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই হবে।’ তার মতে, বিচার ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো না গেলে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি বারবার বিতর্কিত হবে।

এ প্রসঙ্গে অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘এত বছর পার হয়ে গেছে, এটি নিয়ে নাগরিক সমাজ থেকে দাবি ওঠানো হয়নি, এটার সুরাহা হোক। কাদের ভূমিকা সেখানে ছিল, তা জানা যাক।’ তিনি উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ আমলে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে জোর করে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়েও শিক্ষার্থীদের অবস্থানের মুখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকদের পদত্যাগ করতে হয়েছে। তাদের দাবির মুখে অনেক বিচারককে হঠাৎ করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের কয়েকজন ছিলেন বেশ দক্ষ। এই ধরনের ঘটনাকে তিনি বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টির উদাহরণ হিসেবে দেখেন।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলায় রায় দেওয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে ‘মিথ্যাভাবে’ জুলাই হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘এতগুলো মাস পার হয়ে গেছে, এখন অবধি কোনো চার্জশিট নাই; যেখানে বলা হচ্ছে যে জাস্টিস খায়রুল হক ওখানে দাঁড়িয়ে গুলি চালিয়েছেন অথবা গুলির নির্দেশনা দিয়েছেন।’

এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এটা নিয়ে আমরা কি মুখ খুলছি? নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কিংবা বার সমিতি—কেউ না, সবাই চুপ করে আছি।’ তার এই মন্তব্য নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এদিকে, সারা হোসেনের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। অনেকেই তার মন্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী বলে মনে করছেন, আবার কেউ কেউ এর সঙ্গে দ্বিমতও পোষণ করছেন।

ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহমুদুল হাসান লিখেছেন, “গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া নিয়ে এমন খোলামেলা সমালোচনা দরকার ছিল। এতে অন্তত বিতর্কটা সামনে আসে।” অন্যদিকে তানজিলা আক্তার মন্তব্য করেন, “নারী প্রতিনিধিত্বের অভাব নিয়ে তার বক্তব্য একেবারেই যৌক্তিক। এ বিষয়টি অনেক সময়ই উপেক্ষিত হয়।”

তবে ভিন্নমত পোষণ করে রাশেদ করিম লিখেছেন, “সবকিছুকে অগণতান্ত্রিক বলা ঠিক নয়। বাস্তবতার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে।” সাব্বির রহমান নামে আরেকজন লেখেন, “গণভোট নিয়ে তার প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, তবে মানুষ পুরোপুরি না বুঝেই ভোট দিয়েছে—এটা বলা একটু কঠিন।”

বিশ্লেষকদের মতে, সারা হোসেনের বক্তব্যে যেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতার দিক উঠে এসেছে, তেমনি তার কিছু মন্তব্য বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মানদণ্ড, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এই বিষয়গুলো এখন আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

সব মিলিয়ে, এই সাক্ষাৎকার দেশের বিচারব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট মহল এই আলোচনাকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে এবং বাস্তব পরিবর্তনের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

সারা হোসেন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250