বৃহস্পতিবার, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘একাত্তরের গণহত্যাও কি ধর্মের লেবাস চড়িয়েই চালানো হয়নি?’ *** নির্বাচন সামনে রেখে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সুরক্ষার অঙ্গীকার চায় সিপিজে *** টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৯০ ক্রিকেটার ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ *** ‘তারেক রহমান মনোনীত ৩০০ গডফাদারকে না বলুন, বাংলাদেশ মুক্তি পাবে’ *** সরকারি কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–এর পক্ষে প্রচার দণ্ডনীয়: ইসি *** যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের টানাপোড়েনে মধ্যস্থতা করতে চায় তুরস্ক *** ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করছে ইইউ *** হাজিরা পরোয়ানাকে ‘জামিননামা ভেবে’ হত্যা মামলার ৩ আসামিকে ছেড়ে দিল কারা কর্তৃপক্ষ *** আওয়ামী ভোটব্যাংক: জয়-পরাজয়ের অদৃশ্য সমীকরণ *** ‘সজীব ওয়াজেদ জয়ের যুক্তি অযৌক্তিক নয়’

আওয়ামী ভোটব্যাংক: জয়-পরাজয়ের অদৃশ্য সমীকরণ

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৬:৫৩ অপরাহ্ন, ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

শায়লা শবনম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতি এক ব্যতিক্রমী বাস্তবতার মুখোমুখি। একটি বড় ও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ এবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নেতৃত্ব ছত্রভঙ্গ, কিন্তু ভোটব্যাংক অক্ষত। এই ‘নীরব ভোটব্যাংক’ই এখন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অজানা সমীকরণ। প্রশ্ন উঠছে— এই ভোটই কী শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে?

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও তাদের ভোটাররা রাজনীতির বাইরে নেই। বরং কোন দল এই ভোট নিজের দিকে টানতে পারবে— সে প্রতিযোগিতা এখন রাজনৈতিক মাঠের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এমনকি এনসিপিসহ সব দলই প্রকাশ্যে বা নীরবে এই ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কৌশলে নেমেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপির আশঙ্কা—নির্বাচন ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা ‘মেটিক্যুলাস ডিজাইন’-এর দিকে যাচ্ছে কি না, যা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতা মির্জা আব্বাসের বক্তব্য রাজনৈতিক কৌশলের অংশ নাকি বাস্তব উদ্বেগ, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: বিএনপি জানে, শুধু নিজেদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক দিয়ে এই নির্বাচন সহজ হবে না।

অতীতের তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের হিসাব বলছে, বিএনপির ভোট সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আওয়ামী লীগের ভোট ছিল সমান বা অনেক সময় বেশি। আজ আওয়ামী লীগ না থাকলেও সেই ভোট হারিয়ে যায়নি। বরং সেই ভোট কোথায় যাবে—সেই প্রশ্নই পুরো নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।

বিএনপি এই ভোট টানতে তুলনামূলক নরম ও আশ্বাসমূলক কৌশল নিয়েছে। ‘বিনয়ী হয়ে ভোট চাওয়া’, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা না করার প্রতিশ্রুতি, মামলা-হয়রানি বন্ধের বার্তা— সব মিলিয়ে আওয়ামী ভোটারদের জন্য একটি ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চাইছে দলটি। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র— সর্বত্র এই বার্তা এখন বিএনপির রাজনৈতিক ভাষ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন পথে হাঁটছে। তারা রাজনৈতিক বিভাজনের বদলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সহানুভূতি ও ‘ক্ষমার রাজনীতি’র ভাষা ব্যবহার করছে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে জামায়াতের এই কৌশল যে একেবারে কাজ করছে না— এমন নয়। বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সাফল্য জামায়াতকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।

জাতীয় পার্টিকেও হিসাবের বাইরে রাখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শরিক হিসেবে দলটি আওয়ামী ভোটারদের একটি অংশের স্বাভাবিক গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে যারা বিএনপি বা জামায়াত— কোনোটির সঙ্গেই স্বস্তি বোধ করেন না। তবে আওয়ামী ভোটাররা একক কোনো দিকে যাবে— এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট ভাঙবে। কেউ ভোটই দেবেন না, কেউ বিএনপিকে দেবেন, কেউ জামায়াত বা জাতীয় পার্টিকে। এই ভাঙনের মাত্রাই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফল।

এখানেই আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ভোটার উপস্থিতি। আওয়ামী ভোটাররা যদি ব্যাপকভাবে ভোটকেন্দ্রে না যান, তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। দেশে যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। আবার তারা যদি সক্রিয়ভাবে ভোট দেন, তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।

সবশেষে জরিপের কথাও আসছে। বিভিন্ন জরিপে বিএনপি এগিয়ে, কোথাও জামায়াত কাছাকাছি, কোথাও আবার চিত্র ভিন্ন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জরিপ কখনোই চূড়ান্ত সত্য নয়। এখানে শেষ কথা বলবে ভোটের বাক্স।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থেকেও এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে আছে। সুতরাং প্রশ্নটা শুধু ‘আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক কার দিকে যাবে’— এটা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এই ভোটাররা আদৌ কতটা সক্রিয় হবেন, কতটা নিরাপদ বোধ করবেন এবং কোন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে তারা নিজেদের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করবেন।

এই অঙ্ক মেলানো সহজ নয়। সব শংকা কাটিয়ে নির্বাচন যদি হয়, আর সেই নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বলে দেবে—আগামী ত্রয়োদশ সংসদে কারা সরকার গঠন করবে, আর কারা বিরোধীদলের আসনে বসবেন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শায়লা শবনম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250