শনিবার, ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কলেজের নবীনবরণে ‘গানের কনসার্ট’ বন্ধের দাবি কওমি শিক্ষার্থীদের *** ইরান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে, দাবি ট্রাম্পের *** দেশে সাংবাদিকদের আত্মহত্যার ঘটনা বেশি কেন *** ব্রিকস যৌথ ঘোষণায় সম্মতি নেতাদের, একতরফা যুদ্ধের নিন্দা জানাবে জোট *** ডিএনসিসির ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবসের স্টল পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী *** আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি: প্রধানমন্ত্রী *** ফরিদপুরে কার্টনে ভরা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির ৬ টুকরো মরদেহ উদ্ধার *** টুইন টাওয়ার থেকে লাফিয়ে পড়া সেই মানুষটি কে, ‘দ্য ফলিং ম্যান’ নিয়ে ২৫ বছরেও রহস্য *** কিশোরগঞ্জে গর্ভে থাকতেই চার শিশু বিক্রির অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ *** তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

সুখবর এক্সপ্লেইনার

উল্টো রথযাত্রায় ‘জঙ্গি হামলার’ পরিকল্পনা সফল না হলেও উদ্বেগ বাড়ছে

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১১:৫৪ অপরাহ্ন, ২৫শে জুলাই ২০২৬

#

ফাইল ছবি

রাজধানীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী একটি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিস্ফোরকটি সময়মতো শনাক্ত না হলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, শোভাযাত্রাকেই লক্ষ্য করে এটি রাখা হয়েছিল। যদিও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ঘটনার পর কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পুলিশের অন্য সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তকারীরা গত ১৬ জুলাই রথযাত্রাকে ঘিরে পাওয়া জঙ্গি হামলার হুমকির তথ্যও নতুন করে পর্যালোচনা করছেন। তাদের ধারণা, দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে উল্টো রথযাত্রা শুরু হয়। সন্ধ্যার দিকে শোভাযাত্রাটি মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য একটি ছাতা পড়ে থাকতে দেখেন। সেটি পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেন। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলকে খবর দেওয়া হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে শোভাযাত্রাকে অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। জনসমাগম কমে গেলে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে আইইডিটি ধ্বংস করা হয়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরকটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে কেউ ছাতাটি খুলতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। এর ভেতরে ছিল বিস্ফোরক পদার্থ, ব্যাটারি, সার্কিট, লোহার টুকরা ও বিয়ারিং বল। এসব উপাদান বিস্ফোরণের পর স্প্লিন্টারের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারত। বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় একজন পথচারী আহত হন। তবে শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষ বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান।

ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, বোমাটি রথযাত্রাকে লক্ষ্য করেই রাখা হয়েছিল কি না, সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের রথযাত্রার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার হুমকি এবং গোয়েন্দা সতর্কতা পাওয়া গিয়েছিল। সে সময় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উল্টো রথযাত্রার দিন নিরাপত্তার মাত্রা আগের মতো ছিল না। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেউ বিস্ফোরকটি রেখে যেতে পেরেছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারাও জানিয়েছেন, রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই হুমকির বিষয়টি তারা প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন। তাদের মতে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরও শোভাযাত্রার পথের এত কাছে একটি আইইডি পৌঁছে যাওয়া উদ্বেগজনক। এতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং উগ্রবাদ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, দেশে জঙ্গিবাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা অতীতের তুলনায় দুর্বল হলেও মতাদর্শগত তৎপরতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপটেড যোগাযোগব্যবস্থা এবং ছোট ছোট গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এখনো সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণেও একই ধরনের সতর্কতার কথা উঠে এসেছে। রয়টার্স কয়েকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিলীন হয়নি এবং নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। আল জাজিরা–এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে অনলাইনে উগ্রবাদী প্রচারণা এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের প্রচেষ্টার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, সুখবর ডটকম–এও বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, উগ্রবাদী মতাদর্শ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গিবাদ দমনে শুধু অভিযান নয়, গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে আলোচিত কয়েকটি মামলার আসামি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তাদের গতিবিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই জামিনে মুক্ত ব্যক্তিদের ওপর কার্যকর নজরদারি এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

একই সঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, উগ্রবাদ দমনে বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তারা বলছেন, জঙ্গিবাদ একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে এর মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হওয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী মনে করেন, জঙ্গিবাদকে কখনোই অতীতের সমস্যা বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। তার মতে, যেসব ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে উগ্রবাদ দমনে দক্ষতা অর্জন করেছে, তাদের সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন সদস্যদের আধুনিক আইইডি শনাক্তকরণ ও সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।

তদন্তকারীরা এখন ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল আলামত এবং আশপাশের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছেন। বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণের উৎসও খুঁজে দেখা হচ্ছে। কারা এটি তৈরি করেছে এবং কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে, সেটিই এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উল্টো রথযাত্রার দিন বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি, সেটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির বিষয়। তবে এই ঘটনা মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি পরিকল্পিত হামলা প্রতিহত করা গেলেও ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, জনসমাগম এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনকে কেন্দ্র করে গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা এবং জনসচেতনতা আরও জোরদার করার বিকল্প নেই। কারণ একটি আইইডি সময়মতো শনাক্ত হওয়ায় যে বিপর্যয় এড়ানো গেছে, ভবিষ্যতে একই ধরনের হুমকি ঠেকাতে প্রয়োজন আরও সমন্বিত ও ধারাবাহিক প্রস্তুতি।

উল্টো রথযাত্রা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250