ছবি: সংগৃহীত
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, আইনি অবস্থান এবং জনসমর্থন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্নার এক সাক্ষাৎকারকে ঘিরে। সম্প্রতি বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কার্যকারিতা, দেশের অর্থনীতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ইতিহাসের উদাহরণ টেনে নানা মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
সাক্ষাৎকারে জেড আই খান পান্না বলেন, ‘দেশের যে ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার সরকার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, অর্থপাচার করেছে। তো শেখ হাসিনার ১৭ বছরে যে পরিমাণ অর্থ পাচারের কথা বলা হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসে কত টাকা হইছে? তার থেকে শতগুণ বেশি। তাই না?’
তার এই বক্তব্যে তিনি একদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গ টানেন, অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থার সময়কাল সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলেন। অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও, এ ধরনের তুলনামূলক মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার কার্যকারিতা নিয়ে পান্না বলেন, ‘একটা দলকে (আওয়ামী লীগ) আইন করে নিষিদ্ধ করেছে। প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি একটা দল, মিনিমাম যার পপুলারিটি এখনো দেশে কম-বেশি ফর্টি পারসেন্ট। এখন এট প্রেজেন্ট আমার ধারণা, ইটস অ্যারাউন্ড সিক্সটি পারসেন্ট। আইন করে নিষিদ্ধ করছে।’
তিনি আরও বলেন, 'সেই দলকে (আওয়ামী লীগ) তো নিষিদ্ধ করে আটকে রাখা যাবে না। আর কোনো দলকেই নিষিদ্ধ করে কেউ রাখতে পারেনি। চীনে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। রাশিয়ায় বলশেভিক পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। নিষিদ্ধ করে রাখা যায়নি। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর পার্টি, ইউএন ফরওয়ার্ড ব্লক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দল-এগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু থাকেনি। আইন করে নিষিদ্ধ করে কোনো রাজনীতি নিষিদ্ধ করা যায় না। রাজনীতি দিয়ে প্রতিরোধ করতে হয়।'
তার এই বক্তব্যে ইতিহাসের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সংগঠনকে কেবল আইনি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দমন করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এ বক্তব্য মূলত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়।
সাক্ষাৎকারে জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’ প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। পান্না বলেন, ‘আমি তো জয় বাংলা বলি এখনো। কাদের সিদ্দিকী এখনো জয় বাংলা বলেন। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী এখনো জয় বাংলা বলেন। অসংখ্য মানুষ জয় বাংলা বলেন। কত মানুষ ধরবে (গ্রেপ্তার)? জয় বাংলা মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। প্রত্যেকটা যুদ্ধে যাওয়ার আগে ও জেতার পরে জয় বাংলা স্লোগানে কাঁইপা উঠসে।’
এই বক্তব্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে যুক্ত একটি স্লোগানের সামাজিক ও আবেগিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তবে সমালোচকরা বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের মন্তব্য নতুন বিতর্কও তৈরি করতে পারে।
শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও মন্তব্য করেন পান্না। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা বয়সজনিত কারণে আজকে হোক কালকে হোক, মারা যেতে পারেন। কিন্তু তার যে এই ফ্লাইওভার, পদ্মা ব্রিজ, এই কর্ণফুলী টানেল, মেট্রো। মেট্রো তো ঢাকাবাসী কোনোদিন ভুলবে না। তারপর ফ্লাইওভার। এ তো ঢাকাবাসী কোনো দিন ভুলবে না।’
এখানে তিনি অবকাঠামোগত উন্নয়নকে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও, এ ধরনের প্রকল্পের প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে পড়ছে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কত বড় অডসিটি যে তারা ৫ আগস্টের পর জাতীয় সংগীত নিয়ে কথা বলেছেন। কে বলেছে? গোলাম আযমের পুত্র। কত বছর না ছিল গুম ঘরে? আট বছর, নয় বছর? তো তার ছয় বছরের বাচ্চা হলো কী করে? আর ওই গামছা আট বছর থাকতে পারে? এ কথা পাগল উম্মাদ ছাড়া কেউ বলতে পারে না।’
সমালোচকরা বলছেন, এখানে ব্যক্তিগত আক্রমণের সুর রয়েছে, যা একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। অন্যদিকে তার সমর্থকরা মনে করছেন, তিনি একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের অযৌক্তিকতা তুলে ধরতে চেয়েছেন।
সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুকে অনেকেই তার বক্তব্যকে সমর্থন করে লিখেছেন, “রাজনীতি কখনো নিষিদ্ধ করে থামানো যায় না, ইতিহাস তাই বলে।” আবার কেউ কেউ লিখেছেন, “আইনের শাসন না থাকলে বড় দলগুলোই সবচেয়ে বেশি সুবিধা নেয়, তাই কঠোর পদক্ষেপ দরকার।”
আরেকজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, “পান্না সাহেব যেটা বলছেন, সেটা বাস্তবতা—জনসমর্থন থাকলে কোনো দলকে মুছে ফেলা যায় না।” তবে সমালোচনামূলক মন্তব্যও কম নয়। একজন লিখেছেন, “এভাবে তুলনা করে অর্থপাচারের বিষয়কে হালকা করা ঠিক নয়।”
জাতীয় সংগীত ও গুম প্রসঙ্গে তার মন্তব্য নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “গুমের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে এমন মন্তব্য দুঃখজনক।” অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, “রাজনৈতিক বক্তব্যে আবেগ থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন সীমা না ছাড়ায়।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সাক্ষাৎকারটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে নিয়ে এসেছে—একদিকে দল নিষিদ্ধের প্রশ্ন, অন্যদিকে জনসমর্থনের বাস্তবতা, পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যের ভাষা ও শালীনতা।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দল নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার বিরোধী দল বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এসব দল কোনো না কোনোভাবে পুনরায় সংগঠিত হয়েছে বা অন্য নামে কার্যক্রম চালিয়েছে। এই বাস্তবতায় পান্নার বক্তব্য একটি পুরনো প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে এনেছে—রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের সর্বোত্তম উপায় কি আইন, নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা?
সব মিলিয়ে, জেড আই খান পান্নার এই সাক্ষাৎকার কেবল একটি ব্যক্তিগত মতামত নয়; এটি দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আইন, ইতিহাস, জনমত এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার এই জটিল সমীকরণে শেষ পর্যন্ত কোন পথ কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সময় ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপরই।
খবরটি শেয়ার করুন