শনিবার, ২৯শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** মক্কা চুক্তিসহ বাংলাদেশের সব ঘটনার ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে ভারত *** ফেসবুক থেকে নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’ সাংবাদিকেরা, ভয়ের এই প্রবণতাকে কীভাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা *** অনলাইনে মত প্রকাশে ভয়, নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’ সাংবাদিকদের কেউ কেউ: জরিপ *** বন্যায় মৃত নারীর কান থেকে গয়না চুরি, ভিডিও ভাইরালের পর গ্রেপ্তার ২ *** নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৫৫২ *** নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯ *** ‘স্যার, কসম করেন’, ধরা পড়ার আগে পুলিশের সঙ্গে মোবারকের কথোপকথন *** বাংলাদেশ যেন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ না দেয়, সেই বার্তা দিতেই কী ঢাকায় এসেছিলেন পরাগ জৈন *** ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান বিএনপি নেতার, ভিডিও ছড়াতেই শোকজ *** অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট

ফেসবুক থেকে নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’ সাংবাদিকেরা, ভয়ের এই প্রবণতাকে কীভাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ১১:৪৩ অপরাহ্ন, ২৮শে আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’ দেশের কিছু সাংবাদিক। জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে কথা বলার আগে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবছেন তারা। কারও ভয় অনলাইন হয়রানি নিয়ে। কেউ আবার হুমকি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, মামলা বা চাকরি ও পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। আবার কারও উদ্বেগ আরও গভীর। অনলাইনে দেওয়া একটি মত বা মন্তব্যের জেরে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও কেউ কেউ চিন্তিত।

ডেটা সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ডেটাফুলের ‘এক্সপ্রেশন পালস’ জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। ১০ থেকে ২৫ আগস্ট পরিচালিত এই জরিপে অংশ নিয়েছেন ২২ সংবাদকর্মী। ডেটাফুল অবশ্য স্পষ্ট করে বলেছে, এটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ নয়। অংশগ্রহণকারীদের দৈবচয়নের ভিত্তিতে বাছাই করা হয়নি। তাই এর ফলাফল দিয়ে দেশের সব সাংবাদিকের পরিস্থিতি বিচার করা যাবে না।

তবে ছোট পরিসরের এই জরিপেও যে প্রবণতা ধরা পড়েছে, সেটিকে একেবারে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২২ জনের মধ্যে ১৮ জন বলেছেন, গত ছয় মাসে সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতির আশঙ্কায় তারা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছেন। তাদের ১৩ জন বলেছেন, তারা প্রায়ই এমনটি করেছেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে অন্য সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা হয়রানির প্রভাব নিয়ে। এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ২১ জনই বলেছেন, অন্য সাংবাদিকের ওপর অনলাইনে আক্রমণ বা হয়রানির ঘটনা তাদের নিজেদের মত প্রকাশের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ১২ জন বলেছেন, প্রভাবটি উল্লেখযোগ্য। ৯ জন বলেছেন, কিছুটা প্রভাব পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই প্রবণতাকে ‘চিলিং ইফেক্ট’ বা ভীতির কারণে মত প্রকাশ থেকে পিছিয়ে যাওয়ার প্রভাব বলা যায়। অর্থাৎ কাউকে সরাসরি চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু অন্য একজনের ওপর আক্রমণ দেখে তিনি নিজেই চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এক সাংবাদিকের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনা তখন অন্য সাংবাদিকদের মধ্যেও ভয় তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিক নিরাপত্তা সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজে বহু বছর ধরে এ ধরনের ঝুঁকির কথা বলে আসছে। সংগঠনটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনলাইন হয়রানি এখন সাংবাদিকদের পেশাগত ঝুঁকির একটি বড় অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাংবাদিকদের কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও একই সঙ্গে এটি তাদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিও তৈরি করছে।

সিপিজের একটি বিশ্লেষণে অনলাইন হয়রানিকে সাংবাদিকদের জন্য বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশ্লীলতা ও ঘৃণামূলক বক্তব্য সাংবাদিকদের মানসিক চাপ বাড়ায়। গুরুতর হুমকি কখনো বাস্তব জীবনেও পৌঁছাতে পারে।

এ কারণে ফেসবুক থেকে সাংবাদিকের দূরে সরে যাওয়া সব সময় নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ নয়। এটি কখনো কখনো নিরাপত্তা কৌশলও হতে পারে। সিপিজের সাংবাদিক নিরাপত্তা পরামর্শে অনলাইন হয়রানি গুরুতর হলে কিছু সময়ের জন্য অফলাইনে থাকার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো সাংবাদিক যদি হামলা বা হুমকির কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, সেটিকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর পেছনে নিরাপত্তার বাস্তব উদ্বেগও থাকতে পারে।

আল জাজিরার একটি বিশ্লেষণেও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই ভয়ের প্রভাবকে ‘চিলিং ইফেক্ট’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে সাংবাদিক ও মতপ্রকাশের ওপর চাপের ফলে মানুষ কী লিখবেন বা বলবেন, তা নিয়ে আগেই সতর্ক হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে সীমারেখাও অনেক ক্ষেত্রে ঝাপসা হয়েছে। ফলে একজন সাংবাদিকের ওপর চাপের প্রভাব আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সিপিজে ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলেছিল, সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি হামলা কমলেও ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়তে পারে। কর্তৃপক্ষের চাপ, প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং নানা ধরনের ভয় দেখানোর ফলে সাংবাদিকেরা নিজেরাই কিছু বিষয় এড়িয়ে চলতে শুরু করতে পারেন।

আল জাজিরাও পাকিস্তানের সাংবাদিকদের নিয়ে এক প্রতিবেদনে একজন সাংবাদিকের বক্তব্য তুলে ধরেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, কী করলে কারা অসন্তুষ্ট হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সাংবাদিকেরা নিজেরাই আত্মনিয়ন্ত্রণ করছেন। ওই সাংবাদিকের ভাষায়, ভয় থেকে যে আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়, সেটিই সবচেয়ে খারাপ ধরনের নিয়ন্ত্রণ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ডেটাফুলের জরিপে ১৯ সাংবাদিক বলেছেন, তারা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি, সরকারের সমালোচনা, ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলেন।

অর্থাৎ, যে বিষয়গুলো নিয়ে একজন সাংবাদিকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকার কথা, সেখানেই একটি অংশ পিছিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত মত প্রকাশের নয়। এর সঙ্গে জনপরিসরে তথ্য ও মতের বৈচিত্র্যও জড়িত।

জরিপে অংশ নেওয়া ২২ জনের মধ্যে ১৫ জন বলেছেন, ছয় মাস আগের তুলনায় তারা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশে কম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাদের ৯ জন বলেছেন, স্বাচ্ছন্দ্য অনেক কমেছে। ৬ জন বলেছেন, কিছুটা কমেছে।

আর ১৩ জন জানিয়েছেন, এই ভয় তাদের ব্যক্তিগত মত প্রকাশের পাশাপাশি পেশাগত সাংবাদিকতার ওপরও প্রভাব ফেলেছে। এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্ট আর তার পেশাগত সাংবাদিকতা সব সময় আলাদা থাকে না। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভয় পেলে একই বিষয়ে রিপোর্ট করার সময়ও অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যেতে পারেন।

দেশে সাংবাদিকদের ওপর আগের সময়ের নানা ধরনের চাপের অভিজ্ঞতা এই ভয়কে আরও জটিল করেছে। ডেটাফুলের জরিপে অবশ্য বর্তমান সময়ের নির্দিষ্ট কোনো সরকারি পদক্ষেপকে এই ভয়ের একমাত্র কারণ বলা হয়নি। বরং সাংবাদিকদের উদ্বেগের তালিকায় রয়েছে অনলাইন হয়রানি, হুমকি, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, সুনামহানি, কর্মস্থলের চাপ, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, আইনি জটিলতা এবং শারীরিক নিরাপত্তা।

এখানে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময় সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতি, গ্রেপ্তার, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল, গণহারে মামলা এবং মব বা দলবদ্ধ হামলার মতো অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই মাত্রার ঘটনা আগের মতো দেখা যাচ্ছে না। ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একই ধরনের বড় পরিসরের সরকারি দমন-পীড়নের চিত্রও স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সাংবাদিকদের ভয় পুরোপুরি চলে গেছে। বরং ডেটাফুলের জরিপ বলছে, ভয় অনেক সময় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ছাড়াও তৈরি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দলবদ্ধ আক্রমণ, রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিক্রিয়া, পেশাগত চাপ কিংবা অন্য সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও একজন সাংবাদিককে নিজের বক্তব্য সীমিত করতে বাধ্য করতে পারে।

দেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও সাম্প্রতিক সময়ে স্বনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ২৫ জুলাই ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর এক প্রতিবেদনে গণমাধ্যমে বাড়তে থাকা স্বনিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক চাপ ও আর্থিক সংকটকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়। আলোচনায় অংশ নেওয়া সাংবাদিকেরা পেশাগত মান, নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

৭ আগস্ট টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত এক সেমিনারে সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও সাংবাদিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণ না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিকদের অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা উচিত। একই সঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বিষয়টি বাসস, এনটিভিসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে এই ভয় যে একেবারেই নতুন, তা-ও নয়। প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক আলোচনার প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে স্বনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা থাকার কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছিল, সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও মামলা বা অন্যান্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা অনেককে আগে থেকেই ভাবতে বাধ্য করে—কী লেখা যাবে, কী লেখা যাবে না।

সাম্প্রতিক সময়েও সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগ এসেছে। প্রথম আলো সিপিজের বরাতে সাংবাদিক তানবিরুল মিরাজ রিপনকে হয়রানি বন্ধের আহ্বানের খবর প্রকাশ করেছে। সিপিজে জানিয়েছিল, তাকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের কার্যালয়ে তলব করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এখন সাংবাদিকদের অনলাইন নিরাপত্তা নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের মার্চে ইউক্রেনের সাংবাদিক আন্না কালিউঝনাকে ফেসবুক পোস্টের কারণে অনলাইন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সিপিজে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি বলেছে, সাংবাদিকদের যেন প্রতিশোধের ভয় ছাড়া কাজ করতে দেওয়া হয়।

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন হয়রানি সব সময় সরকারের কাছ থেকে আসে না। রাজনৈতিক দলের সমর্থক, সংগঠিত গোষ্ঠী, বেনামি অ্যাকাউন্ট কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেও সাংবাদিক আক্রান্ত হতে পারেন। পাকিস্তানের নারী সাংবাদিকদের নিয়ে সিপিজের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনলাইন আক্রমণের মাত্রা এত বেশি হয়েছিল যে একজন সাংবাদিক নিজের কাজ প্রচার করতেও ভয় পাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন।

ফলে ফেসবুক থেকে একজন সাংবাদিকের ‘গুটিয়ে নেওয়া’কে শুধু ফেসবুক ব্যবহার কমে যাওয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্যে একটি বড় সামাজিক সংকেত থাকতে পারে। সাংবাদিক যদি মনে করেন, একটি মত প্রকাশ তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে, তাহলে তিনি মত প্রকাশ না করার পথ বেছে নিতে পারেন। প্রথমে একটি পোস্ট বাদ যাবে। পরে একটি মন্তব্য। এরপর হয়তো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে রিপোর্টও করা হবে না।

এভাবেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে পেশাগত সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কারণ সাংবাদিক নিজে চুপ হয়ে গেলে সেন্সর করার জন্য সব সময় কাউকে সামনে আসতে হয় না।

তবে ডেটাফুলের জরিপ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। ২২ জনের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশের কয়েক হাজার সাংবাদিকের পরিস্থিতি বিচার করা সম্ভব নয়। বরং এই জরিপকে একটি সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে।

এই সংকেতের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ জরিপে ২১ জনের মধ্যে ২১ জনই বলেছেন, অন্য সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ বা হয়রানি তাদের নিজেদের মত প্রকাশে প্রভাব ফেলে। ১৮ জন জনস্বার্থের বিষয়ে মত প্রকাশ থেকে বিরত থাকার কথা বলেছেন। ১৫ জন আগের তুলনায় কম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। আর ১৩ জন বলেছেন, এর প্রভাব তাঁদের পেশাগত সাংবাদিকতার ওপরও পড়ছে।

গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকের কাজ শুধু খবর প্রকাশ করা নয়। প্রশ্ন তোলা। ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। ভিন্ন মত সামনে আনা। জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা। তাই সাংবাদিকেরা যদি ভয় থেকে নিজেদের বক্তব্য সীমিত করতে থাকেন, তাহলে ক্ষতিটা শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, একসময় সমাজে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে কাউকে সরাসরি চুপ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। সবাই সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে নিজেরাই চুপ হয়ে যাবেন।

ডেটাফুলের ‘এক্সপ্রেশন পালস’ জরিপ আপাতত সেই সম্ভাবনারই একটি ছোট ছবি দেখাচ্ছে। এটি হয়তো পুরো দেশের চিত্র নয়। কিন্তু সাংবাদিকদের একটি অংশ যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’, সেটি যে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার, জরিপের সংখ্যাগুলো সেই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে।

সাংবাদিক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250