ফাইল ছবি
১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ আর ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে উচ্চকণ্ঠে স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমেছিলেন নূর হোসেন। তারপর পুলিশের লক্ষ্যভেদী গুলিতে বনপাখির মতো লুটিয়ে পড়েছিলেন রাজপথে। শহীদ হলেন নূর হোসেন। তিনি গণআন্দোলনের এক উজ্জ্বল পতাকা হয়ে গেলেন।
১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নূর হোসেন। তিনি শহীদ হলে সে সময় জাতীয় রাজনৈতিক দলের নেতা এবং তাদের সহযোগীরা তার পিতার ভাড়া বাসায় গিয়ে সান্ত্বনা দেন। তখন শুধু যাননি জাতীয় পার্টি আর জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।
নূর হোসেনের শ্রমজীবী পিতা মজিবুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের সমর্থক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর গভীর বিশ্বাস ছিল তার। ভালোবাসতেন আওয়ামী লীগকে। আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থাশীল হন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হলে ঢাকার মিরপুরের মাজার রোডে ৫ কাঠা পরিমাণ একটি ডোবা জমি পেয়েছিল মজিবুর রহমানের পরিবার।
তার আওয়ামী লীগের প্রতি ভালোবাসা, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডে গভীরভাবে আঘাত পাওয়া এবং শেখ হাসিনার সরকার তার পরিবারকে ঢাকায় জমি দেওয়ার বর্ণনা নিজের লেখায় দিয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও দেশের পাঠকনন্দিত পত্রিকা দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান।
তার বর্ণনায় উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থাশীল হয়েছেন শহীদ নূর হোসেনের বাবা মজিবুর রহমান। পল্টন ময়দানে (ঢাকা) একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে আলতাফ মাহমুদের কণ্ঠে ‘ও বাঙালি, ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি’ গান শুনে চোখের পানি ঝর ঝর করে পড়েছে তার। কেঁদে আকুল হয়েছেন মজিবুর রহমান। এ সময়ের পর থেকে মজিবুর রহমান জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের এবং আওয়ামী লীগের সকল কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এভাবে পুরো ষাটের দশকে তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন।
তিনি লেখেন, তার খুব দুঃখ, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বক্তৃতা তিনি শুনতে পারেননি। বেবি ট্যাক্সিতে ভাড়ার বিনিময়ে একটি মৃত রোগীকে বর্মি বাজারে নিয়ে যেতে হয়েছিল। ফিরতে তার রাত ৯টা বেজে যায়। ’৭১-এর ২৭শে মার্চের কারফিউ প্রত্যাহার হলে বিক্রমপুর চলে গিয়েছিলেন মজিবুর রহমান। কিন্তু পেটের দায়, সংসারের মায়ায় কদিন পর ঢাকায় ফিরে আসেন।
মতিউর রহমান বলেন, বাসে টিকাটুলিতে নেমে ঢাকা শহরকে তার (মজিবুর রহমান) ‘রাক্ষসের দেশ’ বলে মনে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে মজিবুর রহমান এক ভীত-সন্ত্রস্ত পরিস্থিতিতে ঢাকায় বাস করেছেন। বেবি ট্যাক্সি চালিয়েছেন। রাজাকারদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছেন। একবার লালকুঠিতে, আবার সায়েদাবাদে পুলিশ তাকে আটক করেছিল।
মতিউর রহমান বলেন, স্বাধীনতা মজিবুর রহমানের মনে নতুন আশা সৃষ্টি করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর গভীর বিশ্বাস ছিল তার। খুশিতে চলছিলেন তিনি। দেশের মঙ্গল হবে। এমন আস্থা তার ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ড তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। তার হত্যার পর আওয়ামী লীগের কেউ প্রতিবাদ করে দাঁড়ায়নি। তার মন ছোট হয়ে যায়।
শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের আলোচ্য লেখাটি দৈনিক সংবাদে ১৯৮৮ সালের ৩১শে জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল। ২০১৩ সালের ১০ই নভেম্বর প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘শহীদ নূর হোসেন’ বইয়ে মতিউর রহমানের লেখাটি সংকলিত হয়। সেখানে ‘প্রথম আলো’র ভাষারীতি অনুসরণ করা হয়। শহীদ নূর হোসেন স্মরণে গত ১০ই নভেম্বর লেখাটি প্রথম আলোতে পাঠকদের জন্য আবার প্রকাশিত হয়।
এতে মতিউর রহমান লেখেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মজিবুর রহমান স্থির করেন, যাকে ভালো লাগবে, তাকে ভোট দেবেন। জিয়াউর রহমানকে ভালো লেগেছিল। তিনি গ্রামে ঘুরেছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে গেছেন। সে জন্য নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তিনিও কিছু করতে পারেননি।
মতিউর রহমান লেখেন, বেবি ট্যাক্সিচালক মজিবুর রহমান ৩৬ বছরকাল ধরে ঢাকায় থেকে বিভিন্ন পেশায় কাজ করে, তিন দশকের রাজনৈতিক ঘটনাবলির উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তিনি একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছেন। তিনি কখনই কারও দুয়ারে, কোনো দলের কাছে সাহায্য নিতে বা কোনো সুবিধার জন্য হাত পাতেননি। এটা তার জন্য এক বড় গর্ব। তার পুত্র নূর হোসেনের মহান আত্মত্যাগ বেবি ট্যাক্সিচালক পিতাকে আরও শক্ত করেছে। পুত্র হারানোর শোকে গভীরভাবে ব্যথিত, কিন্তু আশাবাদ তাকে আরও দৃঢ় করেছে।
২০০৫ সালের ৫ই মার্চ গভীর রাতে, শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা আর বুকের মধ্যে গভীর বেদনা নিয়ে নির্বাক মজিবুর রহমানের মৃত্যু হয়। এরপর 'শহীদ নূর হোসেনের পিতার মৃত্যুর পর কিছু কথা' শিরোনামে আরেকটি কলাম লেখেন মতিউর রহমান। যা ওই বছরের ১৯শে মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার।
লেখাটিতে মতিউর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে উল্লেখ করেন, বৃদ্ধ মজিবুর রহমানের মৃত্যুর সংবাদ কোনো গুরুত্ব পায়নি টেলিভিশন বা দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে। অথচ একসময় সেই গত শতাব্দীর আশির দশকে শহীদ নূর হোসেন আর তার পিতাকে নিয়ে কত না হৈচৈ আর মাতামাতি হয়েছিল। কত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়েছে সভা-সমাবেশে।
তিনি লেখেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৬-২০০১) হলে মিরপুরের মাজার রোডে ৫ কাঠা পরিমাণ একটি ডোবা জমি পেয়েছিল মজিবুর রহমানের পরিবার। সেখানে ধীরে ধীরে কোনো রকমে একটি বাসা করেছেন। এখন তারা শহীদ নূর হোসেনের ভাইবোন সবাই একসঙ্গে থাকেন। ভাই আর ভগ্নিপতিরা নানা পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের অবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এসব দেখে-জেনে ভালো লাগল।
খবরটি শেয়ার করুন