ছবি: সংগৃহীত
আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিতর্কিত লেখক, কলামিস্ট ও সাবেক জাসদ নেতা মহিউদ্দিন আহমদ নতুন করে সরকারি সুবিধা প্রাপ্তির আশায় এমনভাবে বদলে গেছেন, যা তার অনেক পাঠককেও লজ্জিত করছে। নিজের কথিত গবেষণাধর্মী লেখায় তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমাকে দুই-তিন বছর আগেও রাজনৈতিক ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ বললেও এখন তার বর্ণনা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
কয়েক বছর আগেও আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে তিনি বীর উত্তম কর্নেল আবু তাহেরের ফাঁসিকে বলেন ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’, এমনকী ৭ই নভেম্বরের ঘটনার জন্য বিচারের দাবিও জানান। এখন তিনি ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বরের নতুন বয়ান দিয়ে বিএনপিকে খুশি করতে চাচ্ছেন। বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে জিয়ার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি রাতারাতি পাল্টে গেছে বলে অভিযোগ নেটিজেনদের।
সেনাবাহিনী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকাল থেকে কথিত দ্বন্দ্ব চলছিল বলে দাবি করেন মহিউদ্দিন। তার দাবি, দেশের সেনা কর্মকর্তারা নাকি মনে করেন, রাজনীতিবিদেরা (আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সব দল) যখন ভারতে বসে আনন্দ-ফুর্তি করে দিন কাটিয়েছেন আর দলাদলি করেছেন, তখন তারাই বৈরী পরিস্থিতিতে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন একাত্তর সালে। ভয়ংকর এ দাবি কোন তথ্যের ভিত্তিতে করছেন, তা তিনি উল্লেখ করেননি।
শুধু তা-ই নয়, সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেওয়ার জন্য কৌশলে উস্কানি দিচ্ছেন তিনি। তিনি বলেন, "সমাজের অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের মতো এই বাহিনীও (সেনাবাহিনী) ক্ষমতার দাবিদার। এটিকে আর উপেক্ষা করা যায় না। দেখা গেছে, এর পর থেকে সামরিক বাহিনী দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করেনি। তারা ‘বিপথগামী রাজনীতিকদের’ শায়েস্তা করার ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া দায়িত্ব মনে করেছে।"
মহিউদ্দিন আহমদের দাবি, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মাঝরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা চালানো শুরু করলে একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতারা পিছু হটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে ঢোকেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া ও জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তির সংগ্রাম করার বিষয়গুলো তিনি অস্বীকার করার মতো এড়িয়ে গেছেন।
তার দাবি, ভারতীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের আওতায় থেকে তাদের সহায়তায় জিয়াউর রহমানসহ অন্যান্য সেনা কর্মকর্তারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংগঠিত হওয়ার আগেই সামরিক নেতৃত্ব সংগঠিত করেছিলেন একাত্তরে। তারা একটি সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকে মহিউদ্দিন আহমদ 'সেনা বিদ্রোহ' হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন। চাচ্ছেন ইতিহাসের 'সামরিকীকরণ' করতে।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে মহিউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন। গত ৮ই নভেম্বর পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণে তার লেখাটি ‘রাজনীতির সমীকরণ পাল্টে দেওয়ার দিন’—শিরোনামে প্রকাশিত হয়। লেখাটিতে তাহেরের চরিত্রহননের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া জামায়াতে ইসলামীকেও তিনি তুষ্ট করতে চেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই মহিউদ্দিন আহমদই সাড়ে ১২ বছর আগে প্রথম আলোতে লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনীতির সামরিকীকরণ নানাভাবে হচ্ছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও অবদানকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। কিন্তু তারাই প্রধান ভূমিকা রেখেছেন, এটা দাবি করলে ইতিহাসের অপলাপ হবে। একাত্তর ছিল এ দেশের মানুষের ২৪ বছরের গণসংগ্রামের ফসল। তাতে নানা স্রোতোধারা ছিল। হঠাৎ একটি ভাষণ বা ঘোষণা থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি’ (সূত্র: ২রা জুন, ২০১৩)।
তখন তিনি লেখেন, ১৯৭১-এ যখন এ দেশের মানুষ জনযুদ্ধে লিপ্ত, তখন আমাদের সেক্টর কমান্ডারদের অনেকেই দৃষ্টিকটুভাবে ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ’৭১ থেকে ’৮১—এই ১০টি বছর হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইতিহাস, যার পরিণতিতে চারজনই নৃশংসভাবে নিহত হন। প্রথম বলি ছিলেন খালেদ মোশাররফ। এ দেশে তিনিই সম্ভবত একমাত্র ক্ষমতা দখলে নেওয়া জেনারেল, যিনি একটি মানুষও হত্যা করেননি। পরবর্তী সময়ে তাহের শিকার হলেন বিচারিক হত্যাকাণ্ডের।
তিনি আরো লেখেন, "৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের জন্য তাহের ও অন্যদের ‘বিচার’ হয়নি। ‘বিচার’ হয়েছিল ৭ই নভেম্বর-পরবর্তী কার্যকলাপের জন্য।"
মহিউদ্দিন আহমদের সবশেষ লেখা উপসম্পাদকীয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী আলোচনা চলছে নেটিজেনদের মধ্যে। তারা বলছেন, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিশেষ একটি পত্রিকা এবং তাদের প্রকাশনা সংস্থার ‘দরবারী লেখক’ হিসেবে বিকৃত ইতিহাস লেখার দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। এককালের জাসদকর্মী, হালের জামায়াত-বিএনপি-এনসিপির মেন্টর মহিউদ্দিন আহমদ দিনের পর দিন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মনগড়া ইতিহাস লেখেন।
সাড়ে ১২ বছর পর মহিউদ্দিন আহমদ গত ৮ই নভেম্বরের উপসম্পাদকীয়তে লেখেন, ২৫শে মার্চ মাঝরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আক্রমণ চালালে মানুষ দিশাহারা হয়ে যায়। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগানে যারা এত দিন রাজপথ কাঁপিয়েছেন, তারা প্রাণ বাঁচাতে ছোটেন সীমান্তের দিকে। পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী আর সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে তারা পিছু হটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে ঢোকেন।
তার দাবি, ৪ঠা ও ৫ই এপ্রিল (১৯৭১ সালে) কয়েকজন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় একটি চা-বাগানের ম্যানেজারের বাংলোয় প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসেন। সেখানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জিয়াউর রহমান, কে এম সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ ও রফিকুল ইসলাম। উপস্থিত হয়েছিলেন কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী।
তিনি লেখেন, কীভাবে তারা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হলেন, এটি একটি প্রশ্ন। তারা সবাই ভারতীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের আওতায় ছিলেন। শুরুর দিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাদের সব ধরনের সহায়তা দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংগঠিত হওয়ার আগেই সামরিক নেতৃত্ব সংগঠিত হয়েছিল। তারা একটি সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন।
তিনি লেখেন, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে প্রশাসন নিজের হাতে নেন। স্বাধীন দেশে সামরিক কমান্ডের নতুন যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে একটি অদৃশ্য দ্বন্দ্ব চলে আসছিল রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনে করেন, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ঔরসে জন্ম নেওয়া বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা মনেপ্রাণে লালন করেন পাকিস্তানবাদ তথা রাজনীতিতে সামরিক কর্তৃত্ব।
তিনি দাবি করেন, সেনা কর্মকর্তারা মনে করেন, রাজনীতিবিদেরা যখন ভারতে বসে আনন্দ-ফুর্তি করে দিন কাটিয়েছেন আর দলাদলি করেছেন, তখন তারাই বৈরী পরিস্থিতিতে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী আর দশটা দেশের বাহিনীর মতো ‘মার্সেনারি’ নয়। তারা মুক্তিযুদ্ধের উদ্যোক্তা ও ফসল। সুতরাং দেশটা কীভাবে চলবে, এ ব্যাপারে তাদের একটা ভূমিকা থাকা দরকার। এই দ্বন্দ্ব দিন দিন বাড়ছিল।
নেটিজেনদের মতে, লেখার শুরুতেই মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘৭ই নভেম্বরের সুলুকসন্ধান করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে একাত্তরে। ২৫শে মার্চ মাঝরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আক্রমণ চালালে মানুষ দিশাহারা হয়ে যায়। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগানে যারা এত দিন রাজপথ কাঁপিয়েছেন, তারা প্রাণ বাঁচাতে ছোটেন সীমান্তের দিকে। পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী আর সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে তাঁরা পিছু হটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে ঢোকেন।’’
লেখাটিতে তার মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিলের দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। কারণ, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো স্লোগানে যারা এত দিন রাজপথ কাঁপিয়েছেন’ তারা কি সবাই ‘প্রাণ বাঁচাতে’ সীমান্তের দিকে ছুটেছিলেন, নাকি প্রয়োজনী প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশে ছুটেছিলেন? ‘সবাই যদি প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের দিকে ছোটেন’, তাহলে যুদ্ধ করেছিলেন কারা?
‘পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী আর সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যেরা প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন’— এটা সত্য। ‘একপর্যায়ে তারা পিছু হটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে ঢোকেন’—এটাও সত্য। যাদের হাতে অস্ত্র ছিল, প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্বও তাদেরই ছিল। সেটাই তারা করেছেন।
পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী আর সামরিক বাহিনীর এই কৃতিত্ব স্বীকার করে নিয়েও তো ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগানে যারা রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন এবং প্রয়োজন মূহুর্তে সীমান্ত পারি দিয়ে যথা সময়ে প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রহ মাতৃভূমি রক্ষার মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন—এ সত্যকে স্বীকার করে নেওয়া যায়।
খবরটি শেয়ার করুন