শনিবার, ৩রা অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী দীনেশ ত্রিবেদী *** শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসছে টানা ১০ দিনের ছুটি *** মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষ চাপে আছে: অর্থমন্ত্রী *** নিম্নমানের বই সরবরাহকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: শিক্ষামন্ত্রী *** চিন্ময় দাসের মুক্তির দাবিতে কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা *** জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী *** শেখ হাসিনা এখনো ভারতে বিশেষ মর্যাদায়, দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে মিলছে সেই ইঙ্গিত *** হুতিদের বিরুদ্ধে বড় অভিযানের প্রস্তুতি সৌদির, অংশ নিতে পারেন লাখো ইয়েমেনি সেনা *** জামায়াতের আখতারুজ্জামান এক দিনের রিমান্ডে *** ইসরায়েলগামী বিমানের ককপিটে কুড়াল নিয়ে হামলা, সেই সহকারী পাইলটের পরিচয় কী

সুখবর এক্সপ্লেইনার

যাকে কাশ্মীরে নিহত বলেছিল ভারত, তাকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করল পাকিস্তান, নেপথ্যে কী

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৬:৫৪ অপরাহ্ন, ২রা অক্টোবর ২০২৬

#

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

কাশ্মীরে লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসাকে হত্যার দাবি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য শুরু হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জম্মু ও কাশ্মীরের বুদগাম জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হাশিম মূসা নিহত হয়েছেন। তাকে ২০২৫ সালের পাহেলগাম হামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজন এবং লস্কর-ই-তৈয়বার শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে বর্ণনা করেছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যম।

কিন্তু এর এক দিন পরই পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ আসিফ নামের একজন সাবেক পাকিস্তানি সেনাসদস্যকে হাজির করেন। পাকিস্তানের দাবি, এই ব্যক্তিই সেই আসিফ, যাকে ভারতীয় গণমাধ্যম ও কর্তৃপক্ষ কাশ্মীরে নিহত বলে জানিয়েছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপি জানিয়েছে, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ব্যক্তি নিজেও বলেছেন, তিনি জীবিত এবং ৩০ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সময় তিনি বাড়িতেই ছিলেন।

ঘটনাটির সূত্রপাত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিনার কোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বুদগামের কোরাগ-ইউসমার্গ এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী, জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী যৌথ অভিযান শুরু করেছে। পরদিন সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনী জানায়, অভিযানের পর এক লস্কর-ই-তৈয়বা সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই মরদেহটি মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসার বলে পরিচয় প্রকাশ করে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ৩০ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে একই দাবি করে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মুসা ওরফে আসিফ ফৌজি’কে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে হত্যা করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, মে মাসে শুরু হওয়া ‘অপারেশন শেরুওয়ালি’র অংশ হিসেবে তাকে দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করছিল নিরাপত্তা বাহিনী। ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও দাবি করে, মূসার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ২০২২ সাল থেকে জম্মু ও কাশ্মীরে সক্রিয় চার সদস্যের একটি লস্কর গোষ্ঠীর সবাই নিহত হয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে মূসাকে পাকিস্তানের সাবেক সেনাসদস্য এবং স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপ বা এসএসজির সাবেক সদস্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ভারতীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ২০২২ সাল থেকে জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাহেলগাম হামলার সঙ্গেও তাকে যুক্ত করা হয়।

পাহেলগামের হামলাটি ঘটে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হন। এরপর ভারতীয় তদন্ত ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো হামলার সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যোগসূত্রের অভিযোগ করে আসছে। হাশিম মূসাকে সেই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

ভারতের সরকারি বিবৃতির সঙ্গে পাকিস্তানের বক্তব্যের বিরোধটি মূলত নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র আহমেদ শরীফ চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রকাশিত তথ্য, এএনআইয়ের প্রতিবেদন এবং ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর বক্তব্য পাশাপাশি তুলে ধরেন। এরপর তিনি মোহাম্মদ আসিফ নামের ব্যক্তিকে মঞ্চে ডেকে আনেন। ডন জানিয়েছে, পাকিস্তান তাকে সাবেক সেনাবাহিনীর হাবিলদার হিসেবে পরিচয় করিয়েছে।

আসিফ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তার বন্ধুরা তাকে ফোন করে জানান যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। পরে ভারতীয় নম্বর থেকেও তার কাছে ফোন আসে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনকারীরা তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। এএনআইয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখার পর তিনি জানতে পারেন, তার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে তাকে কাশ্মীরে নিহত হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের প্রতিবেদনে এসব বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে।

পাকিস্তানের সামরিক বক্তব্য অনুযায়ী, আসিফ ২০০০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ২০০৫ সালে এসএসজিতে যোগ দেন। ২০২৩ সালে তিনি অবসর নেন। এরপর বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন বলে তিনি জানান। গত কয়েক মাস ধরে রাওয়ালপিন্ডিতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন।

অন্যদিকে, ভারতের সরকারি বিবৃতিতে যে ব্যক্তিকে মুসা ওরফে আসিফ ফৌজি বলা হয়েছে, তাকে শুধু পাকিস্তানের সাবেক সেনাসদস্য হিসেবে নয়, লস্কর-ই-তৈয়বার একজন শীর্ষ কমান্ডার হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তিনি বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তার নিহত হওয়া ওই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য।

এই দুই বক্তব্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন পরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ে। ভারতের দাবি অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে এবং পরে সেটির পরিচয় মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসা হিসেবে শনাক্ত করে। অন্যদিকে পাকিস্তান একই নামের একজন জীবিত ব্যক্তিকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করেছে। এপি ও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের উপস্থাপিত ব্যক্তি নিজেকে সাবেক পাকিস্তানি সেনাসদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং ভারতীয় দাবিকে অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে এপি জানিয়েছে, পাকিস্তানের অভিযোগের পক্ষে আহমেদ শরীফ চৌধুরী স্বাধীন প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

এ কারণে ঘটনাটিকে এখনই ‘ভারতের দাবি মিথ্যা’ কিংবা ‘পাকিস্তানের দাবি মিথ্যা’—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে সামরিক অভিযানে নিহত ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে মরদেহের ছবি, পরিচয়পত্র, আঙুলের ছাপ, দাঁতের নথি, পারিবারিক শনাক্তকরণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার মতো প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এমন কোনো স্বাধীন ফরেনসিক যাচাইয়ের ফল এখনো সামনে আসেনি, যা দুই পক্ষের বিরোধ মিটিয়ে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও মূলত দুই পক্ষের বক্তব্যই উঠে এসেছে। এপি বলেছে, পাকিস্তান একজন জীবিত ব্যক্তিকে হাজির করে ভারতের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে; একই প্রতিবেদনে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টও ঘটনাটিকে ভারত ও পাকিস্তানের পরস্পরবিরোধী দাবির ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, পাকিস্তানের সংবাদ সম্মেলনের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বর্ণনা অবশ্য ভিন্ন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বক্তব্য অনুসারে মূসাকে লস্কর-ই-তৈয়বার গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার এবং পাহেলগাম হামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে অভিযানটির পেছনে কয়েক মাসের গোয়েন্দা তৎপরতার কথাও বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন বলছে, আইএসপিআর মহাপরিচালক ঘটনাটিকে ভারতের ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ বা সাজানো অভিযানের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীন প্রমাণ সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া হয়নি। ফলে এটিও পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষণের দিক থেকে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ আরেক কারণে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। পাহেলগাম হামলার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তীব্র উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো সশস্ত্র ব্যক্তির পরিচয়, তার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে অতীত সম্পর্ক এবং কোনো হামলায় তার ভূমিকা—প্রতিটি দাবিই দুই দেশের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের ১ অক্টোবরের বিশ্লেষণেও হাশিম মূসাকে সাবেক পাকিস্তানি সেনা ও এসএসজি কমান্ডো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তার বিরুদ্ধে কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় থাকার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

ফলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোরাগ-ইউসমার্গ অভিযানে নিহত ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় কী এবং পাকিস্তানের সংবাদ সম্মেলনে হাজির করা মোহাম্মদ আসিফই সেই ব্যক্তি কি না। ভারত যদি মরদেহ শনাক্তকরণের ফরেনসিক প্রমাণ প্রকাশ করে এবং পাকিস্তান হাজির করা ব্যক্তির পরিচয়ের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়, তাহলে বিরোধের একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি হতে পারে। তার আগে পর্যন্ত বিষয়টি ভারত ও পাকিস্তানের পরস্পরবিরোধী সরকারি ও সামরিক দাবির মধ্যেই রয়েছে।

ঘটনাটি একই সঙ্গে দেখিয়ে দিচ্ছে, কাশ্মীরকে ঘিরে তথ্যযুদ্ধ এখন সামরিক অভিযানের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে। একটি পক্ষ যখন কাউকে নিহত বলে ঘোষণা করছে, অন্য পক্ষ তখন একই নামের একজন জীবিত মানুষকে ক্যামেরার সামনে হাজির করছে। এই অবস্থায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংবাদকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণের বদলে প্রাথমিক উৎস, ফরেনসিক প্রমাণ এবং স্বাধীন যাচাইয়ের ফলের দিকে নজর রাখাই হবে তথ্যগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত-পাকিস্তান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250