ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও কখনো কখনো এমন কিছু দৃশ্য সামনে আসে, যা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। ঠিক তেমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা সামনে এসেছে মঙ্গলবার—এক যুবকের কোলে ছোট্ট একটি শিশুর নিথর দেহ, আর সেই ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
রাজধানীর মহাখালী এলাকায় ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছেন এক যুবক। তার কোলে ৩ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ। শিশুটি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) এমন কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
জানা গেছে, কামরাঙ্গীরচর থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে সাদমান নামের ওই শিশুটিকে নিয়ে আসছিল তার পরিবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
প্রকাশিত ছবিগুলোতে দেখা যায়, এক যুবক কাপড়ে মোড়ানো শিশুর মরদেহ কোলে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। এ ছাড়া হাসপাতালের সামনে ৩ মহিলাকে কান্না করতেও দেখা গেছে।
ছবিগুলো প্রকাশ্যে আসার পর মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। কেউ লিখেছেন, “এটা কোনো ছবি না, এটা আমাদের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।” আবার কেউ বলেছেন, “একটা শিশুকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না—এটা শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি না, পুরো দেশের লজ্জা।”
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। বিশেষ করে সম্প্রতি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ার খবর বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন—টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য গাফিলতিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠেছে শোক, ক্ষোভ এবং হতাশা। রাশেদ মাহমুদ নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি? তাহলে কেন এখনো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যু দেখতে হয়?” আরেকজন, তানিয়া ইসলাম, লিখেছেন, “মায়ের বুক খালি হয়ে গেছে, কিন্তু আমরা শুধু ছবি দেখে আবেগ দেখাচ্ছি—সমাধান কোথায়?”
কেউ কেউ আবার সরাসরি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। আরিফ হোসেন নামে একজন মন্তব্য করেন, “রাজধানীতে এসেও যদি চিকিৎসা না পাওয়া যায়, তাহলে গ্রামে থাকা মানুষ কী করবে?” অন্যদিকে নুসরাত জাহান লিখেছেন, “এই শিশুটার মৃত্যু আমাদের সবাইকে দায়ী করে—সরকার, সমাজ, এমনকি পরিবারকেও।”
ছবিতে থাকা যুবক কিংবা শিশুটির পরিবারের সঙ্গে সুখবর ডটকম যোগাযোগ করতে পারেনি। ফলে তাদের বক্তব্য বা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো জানা যায়নি। তবুও যে দৃশ্য সামনে এসেছে, তা নিয়ে মানুষের আবেগ আর প্রশ্ন থেমে নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এমন মৃত্যুর ঘটনা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নানা কারণে এখনও অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায় না—যার ফলাফল কখনো কখনো এমন মর্মান্তিক পরিণতি।
এই ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কেউ বলেছেন সচেতনতা বাড়াতে হবে, কেউ বলেছেন টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এমন ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে।
সবশেষে, ছবিতে দেখা সেই যুবকের নিরব হাঁটা যেন এক গভীর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—একটি শিশুর জীবন কি এতটাই অনিরাপদ? শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কোলে করে নিয়ে যাওয়া সেই ছোট্ট দেহ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের গল্পের মাঝেও কিছু বেদনাদায়ক বাস্তবতা রয়ে গেছে।
সাদমানের মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা—যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এমন আরও অনেক গল্প হয়তো সামনে আসবে, যা আমরা কেউই দেখতে চাই না।
খবরটি শেয়ার করুন