শনিবার, ১০ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৫শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দুর্গাপূজার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত পুরান ঢাকা *** এক মন্দিরেই ১০১ প্রতিমা, ৪ যুগের কাহিনিতে সাজছে ব্যতিক্রমী পূজামণ্ডপ *** রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি, রাষ্ট্র সংলাপের আয়াসসহ ৪ জন ডিবি হেফাজতে *** নরেন্দ্র মোদিকে রাহুল গান্ধীর হুঁশিয়ারি, ‘মি. মোদি, আপনার যা খুশি করুন... সবাইকে গ্রেপ্তার করুন’ *** প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে *** দুর্গাপূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুরের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি *** সবাই পুরুষ জেনেও উড়োজাহাজে সিজেপি নেতাদের ধরতে নারী পুলিশ কেন *** সিজেপির নেতা–কর্মীদের ধরপাকড়ের পেছনে নরেন্দ্র মোদি সরকারের উদ্বেগ কী *** দিল্লিতে বিক্ষোভ: আটকের সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার *** দিল্লিতে বিক্ষোভ: মমতা, কেজরিওয়াল ও নেহা বোরা আটক

‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করছে জঙ্গিরা

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন, ২৩শে আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সিনেমা প্রদর্শনী, কনসার্ট, বাউল গান ও লোকজ আয়োজন বন্ধের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’ নামে বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধের চাপ তৈরি করা হয়েছে, কোথাও মসজিদে সভা করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, আবার কোথাও সরাসরি অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা, বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নব্য জেএমবি অংশের তৎপরতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো কি প্রকাশ্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিরোধিতার আড়ালে তাদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মাজার ও দরগায় হামলা, বাউল ও লোকসংগীতের অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি এবং সামাজিক ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে ‘শরিয়তবিরোধী’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা। জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের আশঙ্কা, রাষ্ট্র ও সমাজে উগ্রতার জন্য যে পরিসর তৈরি হচ্ছে, সেটি নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো কাজে লাগাতে পারে।

সিলেটের বিয়ানীবাজারে এর সর্বশেষ উদাহরণ দেখা গেছে। উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল। কয়েক বছর ধরে লাউতা ইউনিয়নের স্থানীয় তরুণেরা এই আয়োজন করে আসছেন। কিন্তু ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নাম ব্যবহার করে একটি পক্ষ নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। ২০ আগস্ট থেকে এ নিয়ে প্রচার শুরু হয় এবং ২১ আগস্ট বারইগ্রাম বাজার মসজিদে সভা করে আয়োজনটি বন্ধের দাবি জানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে।

তবে ২২ আগস্ট উপজেলা প্রশাসন জানায়, কারও বাধায় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ বন্ধ হবে না। বিয়ানীবাজারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদার মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, নৌকাবাইচ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলা; কোনো গোষ্ঠীর বাধায় এটি থেমে থাকবে না। প্রশাসনের এমন অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তা জানানোর সুযোগ আছে, কিন্তু একটি গোষ্ঠীর চাপের মুখে প্রশাসন যদি নিয়মিতভাবে সাংস্কৃতিক বা সামাজিক আয়োজন বাতিল করতে থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জে জনপ্রিয় ব্যান্ড অ্যাশেজের কনসার্ট বাতিল হয়। পুরোনো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছিল। স্থানীয় ইমাম-উলামা ও ‘তৌহিদী জনতা’ কনসার্টের বিরোধিতা করে সেটিকে ‘শরিয়তবিরোধী’ বলে আখ্যা দেয়। পরে জেলা প্রশাসন অনুষ্ঠানটি বাতিল ঘোষণা করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন না থাকার বিষয়টিও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে কনসার্ট বন্ধের দাবিতে ধর্মীয় গোষ্ঠীর আপত্তি ও কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসে।

একই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইন্সে ঘটে আরও গুরুতর ঘটনা। উচ্চশব্দে গান বাজানো নিয়ে কয়েকজন মাদ্রাসাছাত্র আপত্তি জানান। পরে শতাধিক শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালালে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়। পরে ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করে পুলিশ এবং তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।

এর আগে ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনীও বন্ধ হয়ে যায়। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে সিনেমাটির প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। কিন্তু কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে প্রদর্শনীর বিরোধিতা করে। পরে বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রদর্শনী স্থগিত করেন আয়োজকেরা। সংগঠনটির নেতা নাসুরুল্লাহ মুয়াজ সিনেমার প্রচারপত্রে লাল ক্রস চিহ্ন দিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।

চলচ্চিত্র নির্মাতা আশফাক নিপুণ তখন বলেছিলেন, ইচ্ছামতো সাংস্কৃতিক কাজ বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা সরকারকে আইনিভাবে বন্ধ করতে হবে। তার বক্তব্যের মূল প্রশ্নটি হচ্ছে—কোনো অনুষ্ঠান বা শিল্পকর্ম কারও পছন্দ না হলে তার বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর অধিকার থাকতে পারে, কিন্তু সেই আপত্তির জোরে আয়োজন বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। আইন যদি সেই সীমারেখা স্পষ্টভাবে কার্যকর না করে, তাহলে একপর্যায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে চাপ সৃষ্টি করাই নিয়মে পরিণত হতে পারে।

বাউল শিল্পী আরিফ দেওয়ানও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে লোকসংস্কৃতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করেন। তার মতে, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় দেশে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন আয়োজন নিয়ে এমন ধারাবাহিক বাধা দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক হামলা ও বাধাগুলো শুধু নির্দিষ্ট কোনো অনুষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং সমাজে সংঘাতের প্রবণতা বাড়াচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও নাট্যকর্মী সামিনা লুৎফার মতে, এসব ঘটনা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ। দেশের সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। কিন্তু ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি অংশ যখন সেই বৈচিত্র্যকে মেনে নিতে না চায়, তখন সংঘাত তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে মাজার ও দরগায় হামলার ধারাবাহিকতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় তিনজন নিহত এবং ৪৬৮ জন আহত হন। এতগুলো হামলার বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ১১টি; বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

২০২৬ সালেও মাজার ও বাউল আয়োজন ঘিরে উত্তেজনা থামেনি। ২৯ জুন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কলিমউদ্দিন শাহর মাজারের বার্ষিক ওরশ ও বাউল গানের অনুষ্ঠানে একদল যুবক কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় মাজারের ভক্ত ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি হয়।

লেখক ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার এসব ঘটনাকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, সহিংসতা ইসলামের পথ নয়। নিপীড়ন ও সহিংসতার মাধ্যমে অন্যের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া অপরাধ। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এ ধরনের ঘটনা দেশের লোকঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদের বিরোধী শক্তির উত্থানের ইঙ্গিত দেয়। তিনি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে লোকঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ভিন্ন বিশ্বাসের সহাবস্থান নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ধর্মীয় অঙ্গনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ঢাকার তাকওয়া মসজিদের ইমাম সাইফুল ইসলামের মতে, ইসলাম কোনোভাবেই এ ধরনের হামলা সমর্থন করে না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের কাছে যেতে হবে; নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া বৈধ নয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে দীর্ঘদিন মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করা গবেষক ওয়ালিউর রহমানও মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় তরুণ বা ধর্মীয় জ্ঞান কম থাকা ব্যক্তিরা উত্তেজিত হয়ে এ ধরনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। খেলাফত আন্দোলনের আমিরে শরিয়ত আবু জাফর কাসেমীর বক্তব্যও স্পষ্ট—মতের পার্থক্য যতই থাকুক, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।

এই সাংস্কৃতিক চাপের পাশাপাশি জঙ্গিবাদের তৎপরতা নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি আগস্টে সাভারে একাধিক ঘটনায় বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিষিদ্ধঘোষিত নব্য জেএমবির একটি সক্রিয় চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে। ১১ আগস্ট রাতে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নব্য জেএমবির সদস্য আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আরিফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাভারের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১১টি পাইপবোমা বা আইইডি এবং বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। তদন্তে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা এবং আশুলিয়ার একটি দোকান থেকে উদ্ধার হওয়া প্রেশার কুকার বোমার সঙ্গে এসব বিস্ফোরকের মিল পাওয়ার কথাও উঠে এসেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’ নামে একজনের নাম সামনে এসেছে। তিনি অতীতে জঙ্গিবাদ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে বেরিয়ে আসেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সাভারে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নব্য জেএমবির একটি চক্র সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই চক্রের সদস্যদের যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনে অপ্রচলিত ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহারের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।

জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণা করেছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তিনি বলেন, ‘‘৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যে ত্রুটিবিচ্যুতি তৈরি হয়েছে, এর সুযোগ উগ্র গোষ্ঠীগুলো নিতে পারে। দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই, এটি বলার সুযোগ নেই। কারাগার ভেঙে বা জামিনে এমন কিছু ব্যক্তি ৫ আগস্টের পর বেরিয়ে এসেছেন, যাদের বিরুদ্ধে উগ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আগে থেকেই ছিল। কেবল ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়, এর বাইরেও যে উগ্রবাদ রয়েছে, তাদের বিচরণের একটা মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নিতে পারে। এছাড়া রাজনীতিতে অতীতে যাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাদের উগ্রভাবে ফেরত আসার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে।’’

নূর খান লিটনের বক্তব্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। জঙ্গিবাদ শুধু বোমা হামলা বা অস্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমাজের ভেতরে ভয়, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের পরিবেশ তৈরি করাও উগ্রবাদের জন্য সহায়ক হতে পারে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ‘হারাম’ বা ‘শরিয়তবিরোধী’ বলে বন্ধ করা, মাজারে হামলা, বাউল ও লোকসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা এবং ভিন্নমতের মানুষকে সামাজিকভাবে চাপে ফেলার প্রবণতা সেই পরিবেশকে আরও সংকুচিত করতে পারে।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, যারা দেশকে পেছনে ও অন্ধকারের দিকে নিতে চায় এবং চরমপন্থী রাষ্ট্র হিসেবে দেখাতে চায়, তারাই এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে। বক্তব্যটি রাজনৈতিক হলেও এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা আছে—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা ও সামাজিক অসহিষ্ণুতাকে যদি যথাসময়ে প্রতিরোধ করা না যায়, তাহলে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর জন্য জনপরিসর তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে সংঘটিত ঘটনাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক বিরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আবার এসব ঘটনার প্রত্যেকটির নেপথ্যে জঙ্গি সংগঠন রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না। সমাজে যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করার দাবি জঙ্গি ও উগ্রবাদী মতাদর্শ দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছে, সেগুলোই একের পর এক সামাজিক চাপ, ধর্মীয় আপত্তি বা জনতার নামে বাধার মুখে পড়ছে, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ হওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান রেখে একই সঙ্গে নাগরিকের সাংস্কৃতিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনসম্মত বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা। কোনো আয়োজন বেআইনি হলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠী নিজেদের সামাজিক শক্তির জোরে কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেবে—এটি গ্রহণযোগ্য হলে ভবিষ্যতে সেই ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। আজ কনসার্ট, কাল সিনেমা, পরদিন নৌকাবাইচ, এরপর বাউল গান বা মাজার—এভাবে একের পর এক ক্ষেত্র সংকুচিত হতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর আরেকটি শিক্ষা হলো, উগ্রবাদ মোকাবিলায় শুধু জঙ্গি গ্রেপ্তার করলেই হবে না। যারা সামাজিকভাবে ভয় সৃষ্টি করে, জনতার নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনের সমান প্রয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব জঙ্গি কারাগার ভেঙে পালিয়েছে বা জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে আছে, তাদের খুঁজে বের করা এবং পুরোনো জঙ্গি নেটওয়ার্ক সক্রিয় হচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।

কারণ, জঙ্গিরা সমাজে তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সব সময় নিজেদের নাম ও পতাকা ব্যবহার করবে—এমন নয়। সরাসরি জঙ্গি পরিচয় সামনে না এনে সামাজিক ক্ষোভ, ধর্মীয় অনুভূতি, গুজব বা জনতার ব্যানার ব্যবহার করেও তারা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করতে পারে। দেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং আইনের শাসন—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা।

তৌহিদী জনতা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

দুর্গাপূজার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত পুরান ঢাকা

🕒 প্রকাশ: ০৭:৪৮ অপরাহ্ন, ১০ই অক্টোবর ২০২৬

এক মন্দিরেই ১০১ প্রতিমা, ৪ যুগের কাহিনিতে সাজছে ব্যতিক্রমী পূজামণ্ডপ

🕒 প্রকাশ: ০৭:৩৯ অপরাহ্ন, ১০ই অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি, রাষ্ট্র সংলাপের আয়াসসহ ৪ জন ডিবি হেফাজতে

🕒 প্রকাশ: ০৭:৩২ অপরাহ্ন, ১০ই অক্টোবর ২০২৬

নরেন্দ্র মোদিকে রাহুল গান্ধীর হুঁশিয়ারি, ‘মি. মোদি, আপনার যা খুশি করুন... সবাইকে গ্রেপ্তার করুন’

🕒 প্রকাশ: ০৭:১৬ অপরাহ্ন, ১০ই অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে

🕒 প্রকাশ: ০৬:৩৯ অপরাহ্ন, ১০ই অক্টোবর ২০২৬

Footer Up 970x250