ফাইল ছবি
যুক্তরাজ্যের সুপারশপ ও অনলাইন বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে হঠাৎ বেড়েছে বোতলজাত পানি, ক্যানজাত খাবার, ব্যাটারি, টর্চলাইট ও রেডিওর চাহিদা। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মজুতও সাময়িকভাবে শেষ হয়ে গেছে। তবে এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক হামলা বা আসন্ন বিপর্যয়ের ঘোষণা নেই। বরং জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিকদের অন্তত তিন দিন স্বনির্ভর থাকার প্রস্তুতি নিতে সরকারের আহ্বানের পর এই প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার গত সপ্তাহে ‘বি রেডি’ বা প্রস্তুত থাকুন নামে একটি কর্মসূচির আওতায় নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনা প্রকাশ করে। এতে বন্যা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানি সরবরাহে বিঘ্ন, সাইবার হামলা কিংবা অন্য কোনো সংকটে স্বাভাবিক পরিষেবা ব্যাহত হলে পরিবারগুলোকে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর মতো ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের এই সতর্কবার্তা কতটা সচেতনতা তৈরি করছে আর কতটা ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের ঘোষণার পর কয়েকটি খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আইসল্যান্ড নামের সুপারমার্কেট চেইন জানিয়েছে, সপ্তাহান্তে তাদের ক্যানজাত খাবারের বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। অনলাইন মুদি বিক্রেতা ওকাডো জানিয়েছে, বোতলজাত পানির কয়েকটি ব্র্যান্ড এবং স্যুপের কিছু পণ্য সাময়িকভাবে মজুতের বাইরে চলে যায়।
রেডিও ও টর্চলাইটের বিক্রিও বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতা রবার্ট ডায়াসের হিসাবে, আগের সপ্তাহের তুলনায় তাদের রেডিওর বিক্রি ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, ম্যাপলিন জানিয়েছে, আগের মাসের একই সময়ের তুলনায় তাদের রেডিওর বিক্রি বেড়েছে ৯২ শতাংশ, টর্চলাইটের বিক্রি ২৮৪ শতাংশ এবং মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার বহনযোগ্য যন্ত্রের বিক্রি ১০৬ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অলি মার্শাল বলেন, সরকারের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষ জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে শুরু করেন। তিন দিনে টর্চলাইটের বিক্রি প্রায় চার গুণ হয়েছে।
জরুরি প্রস্তুতির সামগ্রী বিক্রেতা প্রিপার্স শপ ইউকে জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও প্রচলিত পরিষেবার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবহার করা যায়, এমন পণ্যের বিক্রি ৬৫০ শতাংশ বেড়েছে। এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সরকারের নির্দেশনা কেবল জনসচেতনতামূলক বার্তা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা মানুষের কেনাকাটার সিদ্ধান্তেও দ্রুত প্রভাব ফেলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন একটি সরকারি সতর্কবার্তার পর রেডিওর মতো তুলনামূলক কম ব্যবহৃত পণ্যও হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?
এর উত্তর খুঁজতে হলে জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগব্যবস্থার ভূমিকা বুঝতে হবে। বিদ্যুৎ চলে গেলে কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হলে মানুষ পরিচিত তথ্যসূত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। মোবাইল ফোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে বা যোগাযোগব্যবস্থা অচল হলে পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়াও কঠিন হয়ে ওঠে। ব্যাটারিচালিত কিংবা হাত ঘুরিয়ে চালানো যায়, এমন রেডিও তখন সরকারি ঘোষণা, আবহাওয়ার সতর্কতা ও জরুরি নির্দেশনা শোনার বিকল্প মাধ্যম হতে পারে।
যুক্তরাজ্য সরকারের প্রকাশিত নির্দেশনায় তাই শুধু খাবার ও পানির কথা বলা হয়নি। বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় ব্যবহারযোগ্য রেডিও, অতিরিক্ত ব্যাটারি, টর্চলাইট এবং চার্জ করা বিদ্যুৎ সঞ্চয়কারী যন্ত্র রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নগদ অর্থ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী, গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি এবং গরম পোশাক রাখার কথাও বলা হয়েছে।
সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন পান করার অন্তত তিন লিটার পানি ধরে তিন দিনের মজুত রাখা উচিত। অর্থাৎ একজনের জন্য অন্তত নয় লিটার পানি প্রয়োজন। রান্না ও অন্যান্য কাজে আরও পানি লাগতে পারে। খাবারের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য পণ্য রাখতে বলা হয়েছে, যেগুলো খাওয়ার জন্য ফ্রিজের প্রয়োজন নেই এবং যেগুলো রান্না ছাড়াও খাওয়া সম্ভব।
এই নির্দেশনার পেছনে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগ রয়েছে। দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সাইবার হামলা এবং বৈরী রাষ্ট্রের তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ কিংবা আর্থিক লেনদেনের পরিষেবা সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দ্রুত ব্যাহত হতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানায়, সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি, প্রযুক্তিনির্ভরতার দুর্বলতা এবং বৈরী রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড থেকে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় পরিবারগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দিয়ে যুক্তরাজ্য ইউরোপের কয়েকটি দেশের অনুরূপ প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ করছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে তাই কেবল যুদ্ধের আশঙ্কার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। কোনো দেশে সামরিক সংঘাত না থাকলেও বন্যা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানির পাইপ ফেটে যাওয়া কিংবা সাইবার হামলার কারণে জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে। এসব পরিস্থিতিতে নাগরিকদের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা থাকলে উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের দিকে দ্রুত মনোযোগ দিতে পারেন।
সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ড্যান জার্ভিস ২২ অক্টোবর সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে জানান, যুক্তরাজ্যের মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও তারা তা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, ৮৪ শতাংশ মানুষ জরুরি প্রস্তুতি সম্পর্কে সরকার আরও তথ্য দিক বলে চান। এই পরিসংখ্যানই কর্মসূচি চালুর পেছনে জনসচেতনতার ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে।
অর্থাৎ, সরকারের দৃষ্টিতে সমস্যাটি শুধু সম্ভাব্য বিপর্যয় নয়, বরং বিপর্যয়ের সময় সাধারণ মানুষের প্রস্তুতির অভাবও। তিন দিনের সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ সেই ঘাটতি পূরণের একটি উপায়। একই সঙ্গে জরুরি পরিষেবার ওপর চাপ কমানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে সরকারি সতর্কবার্তার পর বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির ঘটনা আর ব্যাপক আতঙ্কে কেনাকাটা এক বিষয় নয়। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান ২৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে জানায়, জরুরি প্রস্তুতির পণ্যের বিক্রি বাড়লেও দেশজুড়ে ব্যাপক আতঙ্কজনিত কেনাকাটা শুরু হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জরুরি সামগ্রী বিক্রেতা জ্যাক ব্রাউন সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, সরকারের কর্মসূচি চালুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় তার প্রতিষ্ঠানে এক মাসের সমপরিমাণ অর্ডার আসে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ল্যাঙ্কাশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান ও মানবিকবিদ্যা বিভাগের সহযোগী ডিন সারিতা রবিনসনের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। তার মতে, এ ধরনের প্রস্তুতিমূলক বার্তা আতঙ্ক সৃষ্টি করে, এমন ধারণার পক্ষে খুব বেশি প্রমাণ নেই। বরং জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ও স্পষ্ট তথ্য পেলে মানুষ আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে পারেন। তথ্য গোপন রাখা বা অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, সরকার যখন নাগরিকদের সংকটের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলে, তখন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চান—কোন বিপদের আশঙ্কা রয়েছে, কতটা গুরুতর সেই ঝুঁকি এবং কেন এখনই প্রস্তুতি প্রয়োজন। এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পেলে কেউ সতর্কবার্তাকে সাধারণ দুর্যোগ প্রস্তুতি হিসেবে নেবেন, আবার কেউ সম্ভাব্য যুদ্ধ বা বড় ধরনের বিপর্যয়ের সংকেত হিসেবেও ব্যাখ্যা করতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এ কারণে নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলেছেন, আতঙ্কিত হতে নয়। ২২ অক্টোবর আইটিভি নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার কথা মাথায় রেখে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, স্থানীয় দোকানের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা অচল হয়ে যাওয়া কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে বিঘ্নের মতো পরিস্থিতিও এর আওতায় রয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করেন, সাইবার হামলার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আধুনিক সমাজের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, মোবাইল যোগাযোগ ও ডিজিটাল লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই ব্যবস্থাগুলোর কোনো একটিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব অন্য ক্ষেত্রগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেমন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া কঠিন হতে পারে, দোকানে পণ্য বিক্রি ও সংরক্ষণ ব্যাহত হতে পারে এবং ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ হয়ে গেলে নগদ অর্থের প্রয়োজন বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে রেডিও, ব্যাটারি, নগদ অর্থ ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবারের মতো সাধারণ সামগ্রীকে সরকার জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছে। এসব পণ্যের প্রতিটির কাজ আলাদা হলেও সম্মিলিতভাবে এগুলো সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পরিবারকে কিছুটা স্বনির্ভর রাখতে পারে।
তবে এই প্রস্তুতির সঙ্গে আরেকটি ঝুঁকিও রয়েছে। সরকারের আহ্বানে যদি মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য কিনতে শুরু করেন, তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। সাময়িকভাবে পণ্যের মজুত কমে যাওয়া, দাম বেড়ে যাওয়া কিংবা সীমিত আয়ের পরিবারের প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহে অসুবিধা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে পানি ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ।
গার্ডিয়ান জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য সরকারের নির্দেশনায় আতঙ্কিত হয়ে একসঙ্গে অনেক পণ্য কেনার পরিবর্তে ঘরে আগে থেকে কী আছে, তা যাচাই করতে বলা হয়েছে। এরপর নিয়মিত বাজার করার সময় অল্প অল্প করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ছয় মাস পরপর মজুত পরীক্ষা করে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বদলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এই পদ্ধতি অনুসরণের আর্থিক গুরুত্বও রয়েছে। একবারে বিপুল পরিমাণ পণ্য কিনলে পরিবারের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ পড়তে পারে। অন্যদিকে, ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিলে ব্যয় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সব পরিবারের প্রয়োজনও এক নয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী মানুষ, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণকারী কিংবা পোষা প্রাণী রয়েছে এমন পরিবারের জন্য আলাদা সামগ্রী প্রয়োজন হতে পারে। ফলে জরুরি প্রস্তুতিকে একটি নির্দিষ্ট পণ্যের তালিকায় সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবারের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
যুক্তরাজ্যের এই উদ্যোগ ইউরোপের বৃহত্তর দুর্যোগ প্রস্তুতি ভাবনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতিতে কয়েক দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো প্রস্তুতি রাখতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর মূল ধারণা হলো, বড় সংকটের শুরুতে উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবাকর্মীরা সব মানুষের কাছে একসঙ্গে পৌঁছাতে নাও পারেন। পরিবারগুলো নিজেদের প্রাথমিক প্রয়োজন সামাল দিতে পারলে সবচেয়ে বিপন্ন মানুষকে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ বাড়ে।
তবে শুধু নাগরিকদের ঘরে খাবার, পানি ও রেডিও রাখার পরামর্শ দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা, সাইবার হামলা প্রতিরোধ, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা, দুর্যোগের সময় দ্রুত তথ্য সরবরাহ এবং বিপন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইটিভি নিউজের প্রতিবেদনে বিরোধী দলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক ছায়ামন্ত্রী অ্যালিসিয়া কার্নসও সরকারের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের ওপর জোর দেন।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যে রেডিও, পানি ও ক্যানজাত খাবার কেনার প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে তাৎক্ষণিক কোনো বিপর্যয়ের নিশ্চিত খবরের চেয়ে সরকারের জরুরি প্রস্তুতির বার্তাই প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। বাজারের বিক্রির পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, মানুষ সেই বার্তায় সাড়া দিয়েছেন। কিন্তু এই সাড়াকে আসন্ন যুদ্ধের প্রমাণ কিংবা দেশজুড়ে আতঙ্কের নিশ্চিত লক্ষণ হিসেবে দেখার ভিত্তি নেই।
বরং ঘটনাটি আধুনিক রাষ্ট্রের একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে: প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল সমাজে ছোট একটি বিঘ্নও বড় ধরনের সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন, তবে সেই প্রস্তুতি হতে হবে তথ্যভিত্তিক, বাস্তবসম্মত ও সামর্থ্য অনুযায়ী। সরকারের দায়িত্ব হলো ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া; নাগরিকদের দায়িত্ব হলো আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া। আর বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার দায়িত্ব হলো, সেই প্রস্তুতির সুযোগে যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা।
খবরটি শেয়ার করুন