ফাইল ছবি
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতি এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম এবং জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর পাঁচ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে সরকারের কার্যক্রম, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংবিধান সংশোধন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে নানা বিতর্ক ও আলোচনা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিতে বিচ্ছিন্নভাবে হামলার ঘটনা ঘটলেও সেটিকে জাতীয় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার কারণ নেই। অন্যদিকে সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর উত্থানকে তিনি নিজের উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির কয়েকটি কর্মসূচিতে বাধা ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। দলটির দাবি, এসব ঘটনার জন্য বিএনপির নেতা-কর্মীরা দায়ী। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, দু-একটি ঘটনা ঘটেছে, এটি তিনি অস্বীকার করছেন না। তবে তার ভাষ্য, এসব কোনোভাবেই বিএনপির কেন্দ্রীয় বা দলীয় সিদ্ধান্তের অংশ নয়। বরং বিএনপির অবস্থান হচ্ছে, সব রাজনৈতিক দল যেন নিজ নিজ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে।
তিনি বলেন, কোথাও যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত। এটিকে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। তার মতে, গণতান্ত্রিক পরিবেশে সব দলই স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবে—এটাই বিএনপির প্রত্যাশা।
সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যগুলোর একটি আসে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে দলটির অর্জনকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফল হিসেবে উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, জামায়াতের এই উত্থান তার নিজের কাছেও উদ্বেগের বিষয়।
তার মতে, এই বাস্তবতার পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট ও গণতন্ত্রের ঘাটতি বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে, বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলেই ডানপন্থী রাজনীতির প্রসার ঘটেছে।
মির্জা ফখরুলের ভাষায়, যদি দীর্ঘদিন একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকত, তাহলে বিএনপি যেমন স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি করতে পারত, তেমনি জামায়াতও তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করত। সেই পরিস্থিতিতে বর্তমান ধরনের উত্থান ঘটত না বলেই তিনি মনে করেন। তার মতে, এটি মূলত গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতির দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি।
জামায়াতের নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে আরও কয়েকটি কারণও তুলে ধরেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি বড় অংশ এবারের নির্বাচনে জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। বিএনপির নিজস্ব পর্যবেক্ষণেও এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে আরেকটি নতুন প্রবণতা দেখা গেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতি সমর্থন দিয়েছে। তার মতে, বিএনপি একটি মধ্যপন্থী ও উদার রাজনৈতিক ধারা প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ভোটার বিএনপির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন।
বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের বর্তমান ভূমিকা নিয়েও নিজের মূল্যায়ন দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। তার মতে, এখন পর্যন্ত জামায়াত নেতিবাচক কোনো ভূমিকা পালন করেনি। তবে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে দলটির অবস্থানকে তিনি ইতিবাচক বলে মনে করেন না।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে অংশ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে মতামত তুলে ধরা উচিত ছিল। আলোচনার বাইরে থেকে অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণই বেশি কার্যকর হতো বলে তিনি মনে করেন। এই একটি বিষয় ছাড়া অন্য ইস্যুগুলোতে জামায়াতের ভূমিকা ইতিবাচক বলেই তার মূল্যায়ন।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সাক্ষাৎকারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না—ডেইলি স্টারের এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলার সুযোগ নেই। কারণ বর্তমান আইনে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিধানই নেই।
সরকারের পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন রয়েছে, সেটিও উঠে আসে সাক্ষাৎকারে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে মানুষের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়।
জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, একটি দেশের সব সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের উদাহরণ দিয়ে বলেন, উন্নত দেশগুলোতেও অপরাধ ঘটে। তাই অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কি না। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এমনকি দলীয় লোকজনের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের সংস্কারের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিনে পুলিশ বিভাগ পুরোপুরি দলীয়করণ হয়ে গিয়েছিল। এখন সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। যারা সরাসরি সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তাদের সরিয়ে দিয়ে দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের সামনে আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি।
প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসার বিষয়েও খোলামেলা মন্তব্য করেন বিএনপির মহাসচিব। সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, মন্ত্রী হিসেবে কয়েক মাসের অভিজ্ঞতায় তার মনে হয়েছে, অনেক কিছুই বদলায়নি। সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, প্রশাসনের একটি বড় অংশ এখনো আগের ধ্যানধারণা থেকে বের হতে পারেনি।
তার ভাষ্য, আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা এখন নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন। এর ফলে প্রশাসনের ভেতরে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যারা ভালো কাজ করেন, তারাও যথাযথ সুযোগ পাচ্ছেন না।
তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির সময়ে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিরোধী দলের ভূমিকা, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি যেমন এনসিপির কর্মসূচিতে হামলার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ও স্থানীয় সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তেমনি জামায়াতের রাজনৈতিক উত্থানকে দেশের গণতান্ত্রিক ঘাটতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি এবং নিজের জন্যও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
খবরটি শেয়ার করুন