ছবি: সংগৃহীত
মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতায় রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখতে না পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই বক্তব্যের পর এবার তিনি জানিয়েছেন, এমন মন্তব্য করেই তিনি ‘বিপদে’ পড়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিবর্তনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন এবং তার নেতৃত্বে তিনি আশাবাদী।
গতকাল সোমবার (৩ আগস্ট) প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলো–এর ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি যে ‘কিছুই বদলায়নি’ মন্তব্য করেছিলেন, সেটি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সাক্ষাৎকারে প্রথম আলো তাকে প্রশ্ন করে, তিনি গত বৃহস্পতিবারই বলেছিলেন, কিছুই বদলায়নি। এর জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, “এগুলো বলে তো বিপদে পড়ি ভাই।”
এরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, “তারেক সাহেব দিনরাত কাজ করছেন। রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি মিটিং করেন, নিজে গাড়ি নিয়ে বের হন, ঢাকা সিটিকে কী করে সুন্দর করা যায়। কিন্তু অন্যরা কী করছেন, সেটা আপনারা নিজেরাই খোঁজ করুন। মন্ত্রীরা চেষ্টা করছেন, সরকারি কর্মকর্তারা কতটুকু আন্তরিকভাবে কাজ করছেন?”
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর ডিএফপি অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, মন্ত্রী হওয়ার চার থেকে পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, “কিছুই বদলায়নি।” তার ভাষায়, আগে যারা ঘুষ খেত, তারা এখনো ঘুষ খাওয়ার ফন্দিফিকির করছে। যারা ভালো কাজ আটকে দিত, তারাও একইভাবে তা করছে। এমনকি ভোল পাল্টানো অনেকেই এখন ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে সামনে আসছেন।
সেদিন তিনি আরও বলেন, “এই কথাগুলো আক্ষেপে বলছি। আমার বয়স অনেক। আমি সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না আমাদের মধ্যে। যদি এই পরিবর্তন আনতে পারি, তাহলেই জুলাই আন্দোলন বা জুলাই বিপ্লবের সফল পরিণতি দেখতে পাব।”
তবে ওই বক্তব্যের পর সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেন, তার হতাশার মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। তিনি বলেন, একজন মানুষের মধ্যে তিনি পরিবর্তনের চেষ্টা দেখছেন, আর তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী নতুন নতুন নজির স্থাপন করার চেষ্টা করছেন। সবাই যদি সেই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব হবে। এজন্য সবাইকে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
একই সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের মেয়াদের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন বিএনপির মহাসচিব। তার মতে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল প্রয়োজনীয় সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করা এবং সংস্কারের জন্য একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা তৈরি করা।
তিনি বলেন, ওই সময় দেশে একটি কঠিন পরিস্থিতি ছিল। একদিকে ভারত থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ তুলে প্রচারণা চালানো হচ্ছিল। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে অন্তর্বর্তী সরকার সক্ষম হয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মতো সংকট মোকাবিলায় উৎপাদন না বাড়লে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রযন্ত্রে পরিবর্তন না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। তার মতে, গত ১৭ বছরে যারা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বড় একটি অংশ এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রয়েছেন। তিনি বলেন, “মেধার ভিত্তিতে চাকরি হয়নি। দেখা হয়েছে কে আওয়ামী লীগ করে, কোন গোষ্ঠীর লোক। তারা এখনো বিভিন্ন জায়গায় আছে। তারা ধীরগতিতে কাজ করে, কাজ করতে চায় না। ঘুষ খাওয়ার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে বের করে আনতেও সময় লাগবে।”
মির্জা ফখরুলের এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে তার কার্যকর প্রভাব নিয়ে আগে থেকেই নানা আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকাই বেশি দৃশ্যমান।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এক অনুষ্ঠানে মীর শাহে আলমকে দেশের “সবচেয়ে পাওয়ারফুল প্রতিমন্ত্রী” বলে উল্লেখ করেন। তার ওই মন্তব্যও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অসন্তোষের জেরে গত ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন। যদিও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো কারণ নিশ্চিত করা হয়নি।
এমন প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুলের ‘কিছুই বদলায়নি’ মন্তব্য এবং পরে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘এগুলো বলে তো বিপদে পড়ি ভাই’ মন্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকদের অনেকে। কারণ, তিনি একদিকে প্রশাসনের জড়তা, দুর্নীতি ও পুরোনো সংস্কৃতির সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন।
ফলে তার বক্তব্যে সরকারের ভেতরের বাস্তবতা, প্রশাসনিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি প্রত্যাশা—এই তিনটি বিষয়ই একসঙ্গে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট করেছে যে, সরকার পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্রযন্ত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন সরকারেরই জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব।
খবরটি শেয়ার করুন