ফাইল ছবি
রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন মানেই প্রশাসনিক সংস্কৃতি বা রাষ্ট্রযন্ত্রের আচরণে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসে না—দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ কথা বহুবার আলোচিত হয়েছে। এবার সেই বাস্তবতার কথাই প্রকাশ্যে তুলে ধরলেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মহাসচিব ও জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রযন্ত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়।
তার ভাষায়, আগে যারা ঘুষ খেত, তারা এখনো ঘুষ খাওয়ার ফন্দিফিকির করছে; ভালো কাজ আটকে দেওয়ার প্রবণতাও বদলায়নি। এমনকি অনেকেই পরিচয় বদলে এখন ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করছেন।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডিএফপি অডিটরিয়ামে জুলাই শহীদ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে প্রকাশনা মোড়ক উন্মোচন, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মির্জা ফখরুল। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, চার থেকে পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, "কিছুই বদলায়নি"। তার অভিযোগ, অতীতে যারা ঘুষ নিতেন, তারা এখনো একইভাবে দুর্নীতির সুযোগ খুঁজছেন। যারা ভালো উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি করতেন, তাদের আচরণেও পরিবর্তন আসেনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অনেকেই নিজেদের অবস্থান বদলে এখন জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।
তার বক্তব্যে হতাশার পাশাপাশি প্রত্যাশারও প্রতিফলন ছিল। তিনি বলেন, বয়সের এই পর্যায়ে এসে তিনি সত্যিকারের পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখনো সেই পরিবর্তন প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখতে পাননি। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী নতুন কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছেন এবং সেই উদ্যোগকে সবাই মিলে এগিয়ে নিতে পারলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন দলের একজন শীর্ষ নেতার মুখে এমন আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খুব বেশি দেখা যায় না। সাধারণত সরকারে থাকা নেতারা প্রশাসনের সাফল্য তুলে ধরতেই বেশি আগ্রহী থাকেন। সেখানে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা সম্পর্কে সরকারের ভেতরের একটি উপলব্ধির ইঙ্গিত বহন করে।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের তুলনায় প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করেন দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ারভিত্তিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, যাদের কাজের ধারা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির কাঠামো রাতারাতি বদলে যায় না। দুর্নীতি, ঘুষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব কিংবা ফাইল আটকে রাখার মতো সমস্যাগুলো ব্যক্তি নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সুশাসনবিষয়ক গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, প্রশাসনিক জবাবদিহি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, কার্যকর অভ্যন্তরীণ তদারকি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ—এসব একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে রাষ্ট্রযন্ত্রের আচরণগত পরিবর্তন আনা কঠিন। তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার কাজের মান, জবাবদিহি এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ভোল পাল্টানো’ ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আনুগত্য পরিবর্তনের অভিযোগ নতুন নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল রাজনৈতিক সংস্কৃতির নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্বের প্রশ্নও সামনে আনে। কারণ কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী যদি পরিস্থিতি অনুযায়ী রাজনৈতিক অবস্থান বদলে নেয়, তাহলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য যদি হয় একটি জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রথম শর্ত হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার। এ ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের পেশাদার সক্ষমতা বৃদ্ধি।
মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি সমর্থনের আহ্বান জানালেও একই সঙ্গে যে হতাশার কথা প্রকাশ করেছেন, তা সরকারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সরকার পরিচালনার কয়েক মাসের মধ্যেই যদি ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে তা সংস্কার কার্যক্রমের গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। আগামী দিনে সরকার এই আত্মসমালোচনাকে কতটা নীতিগত উদ্যোগে রূপ দিতে পারে, সেটিই হবে প্রকৃত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
খবরটি শেয়ার করুন