সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার *** সমালোচনার মুখে হাফেজদের উপহার দেওয়া সেই বই ফেরত নিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী *** অপ্রতিমের মা ড. নাহিদার চব্বিশের সেই ফেসবুক পোস্ট কেন আলোচনায়, কী লিখেছিলেন তিনি *** পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে রক্ষা করতে যুদ্ধে জড়াবে

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ: আওয়ামী লীগের লাভ, না ক্ষতি?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৮:৪৫ অপরাহ্ন, ২৪শে জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এমন এক সময়ে এই পরিবর্তন ঘটল, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছেন। ফলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা—দুই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আরও তীব্র হয়েছে।

অনেকের প্রশ্ন, এই পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক, নাকি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে? বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি একমাত্রিক নয়। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ আওয়ামী লীগের জন্য যেমন কিছু সম্ভাব্য সুবিধা তৈরি করতে পারে, তেমনি দলটির সামনে নতুন কিছু ঝুঁকিও সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব নির্ভর করবে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় এবং সরকার ও বিরোধী দলগুলো কী অবস্থান নেয় তার ওপর।

মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। ২০২৩ সালের এপ্রিলে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পরও রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন। গত দুই বছরে তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক, শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তার পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছিল।

অবশেষে তার পদত্যাগ সেই আলোচনার অবসান ঘটাল। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে এলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এখন নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথ তৈরি হলো। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর এই পরিবর্তনের সময়টিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হলেও সংকটকালে তার ভূমিকা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নির্বাচন, সরকার গঠন, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অবস্থান আলোচনায় আসে।

আওয়ামী লীগের জন্য সম্ভাব্য লাভের একটি দিক হলো—রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল, তা আপাতত শেষ হলো। বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে সমালোচনা করেছে। সেই বিতর্কের অবসান ঘটলে আওয়ামী লীগ অন্তত একটি রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত হতে পারে।

আরেকটি দিক হলো, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক সক্রিয়তা তৈরি হতে পারে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ফলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে গিয়ে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। দলটি চাইলে এটিকে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।

তবে সম্ভাব্য ক্ষতির দিকও কম নয়। সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এমন একজন রাষ্ট্রপতিকে হারাল, যিনি তাদের শাসনামলে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার স্থলাভিষিক্ত যিনি হবেন, তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব নেবেন এবং তার অবস্থান ভবিষ্যতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ প্রভাব আগের মতো থাকবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না হলেও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে তার ভূমিকা প্রতীকী ও সাংবিধানিক গুরুত্ব বহন করবে।

আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে জনমত। যদি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দলটি জনসমর্থন পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু যদি দেশে ফিরে তাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি সংকট আরও গভীর হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির পরিবর্তনও আওয়ামী লীগের জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দেবে না।

অন্যদিকে সরকার ও সরকারসমর্থক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি নতুন সাংবিধানিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে তারা এমন একজনকে দায়িত্বে আনতে চাইবে, যিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে গ্রহণযোগ্য এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সক্ষম। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ফলে বর্তমান সরকার একটি রাজনৈতিক বার্তাও দিতে পারবে যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় তার ওপর।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার আন্তর্জাতিক দিকও রয়েছে। তিনি দেশে ফিরলে বিদেশি গণমাধ্যম, কূটনৈতিক মহল এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজর আবারও বাংলাদেশের দিকে পড়বে। একই সময়ে রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ দেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রস্তুতি, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের উদ্যোগ, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী পরিবেশ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ কেবল একজন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা নয়; এটি দেশের চলমান রাজনৈতিক রূপান্তরের অংশ। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু আওয়ামী লীগের ওপর নয়, সরকারের ওপর, বিরোধী দলগুলোর ওপর এবং ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতির ওপরও পড়বে।

আওয়ামী লীগের জন্য এটি শেষ পর্যন্ত লাভ হবে, নাকি ক্ষতি—তার উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। যদি দলটি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সুযোগে পরিণত করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে যেতে পারে। আবার যদি আইনি, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ে, তাহলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগও সেই চাপ কমাতে পারবে না।

তাই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে আলাদা দুটি ঘটনা হিসেবে নয়, বরং একই রাজনৈতিক সময়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। এই দুই ঘটনার পারস্পরিক প্রভাবই আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শেখ হাসিনা মো. সাহাবুদ্দিন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250