ছবি: সংগৃহীত
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী হিসেবে আন্না মিনজের মনোনয়ন ঘিরে নতুন করে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশি অনুদানপ্রাপ্ত উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামস পদে থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। যদিও নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছে, তবু গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী তার যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক থামছে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনীত এই প্রার্থী দাবি করেছেন, তিনি ইতোমধ্যে তার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি কোনোভাবেই আরপিওর বিধান লঙ্ঘন করেননি। তবে তার পদটি আদৌ ‘নির্বাহী পদ’ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, বিদেশি অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পদে থেকে কেউ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। এমনকি পদত্যাগ বা অবসর নেওয়ার পরও তিন বছর অতিক্রান্ত না হলে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। এই আইনি বিধানটি মূলত স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠেছে—সিনিয়র ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামস পদটি কি নির্বাহী পদ হিসেবে গণ্য হবে?
আন্না মিনজ এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী ছিলাম না। আরপিওতে মূলত প্রধান নির্বাহীদের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। পরিচালকরা নির্বাচন করতে পারেন।” তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরপিওতে শুধু ‘নির্বাহী পদ’-এর কথাই উল্লেখ আছে, ‘প্রধান নির্বাহী’ নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও দাবি করেন, “সিনিয়র ডিরেক্টর পদটি একটি বেতনভুক্ত চাকরি। আমি নির্বাহী পরিচালকের অধীনে কাজ করেছি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলাম না।”
নির্বাচনের হলফনামায় আন্না মিনজ নিজের পেশা উল্লেখ করেছেন ‘বেসরকারি চাকরিজীবী’ হিসেবে। তবে সেখানে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি উল্লেখ করেননি। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি তথ্য গোপন করা? এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মঈন উদ্দীন খান গণমাধ্যমকে বলেন, “হলফনামায় প্রার্থীর পেশার পরিচয় দেওয়া আছে। তিনি ব্র্যাকের পরিচালক ছিলেন কি না—তা কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।”
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে তার উপস্থিতি নিয়ে। জানা গেছে, গত শনিবার রাত পর্যন্ত তিনি সংস্থাটির ‘লিডারশিপ টিমে’ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তবে রোববার সন্ধ্যায় তার নাম আর দেখা যায়নি। তিনি কবে পদত্যাগ করেছেন—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো দেননি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, “যদি কোনো পরিচালক সার্বক্ষণিকভাবে নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে সেটি নির্বাহী পদ হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি তিনি কেবল বোর্ড সদস্য হিসেবে বৈঠকে অংশ নেন, তাহলে তা নির্বাহী নয়। এখানে পদটির প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা জরুরি।” করপোরেট গভর্ন্যান্স বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে অনেক সংস্থায় ‘ডিরেক্টর’ পদটিই কার্যত নির্বাহী দায়িত্ব বহন করে। তাই শুধু পদবির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও। ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহির হাসান লিখেছেন, “আইন যদি সবার জন্য সমান হয়, তাহলে এখানে ব্যতিক্রম কেন? নির্বাহী পদে থাকলে নির্বাচন করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।”
অন্যদিকে, নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, “তিনি যদি সত্যিই পদত্যাগ করে থাকেন এবং আইন লঙ্ঘন না করেন, তাহলে তাকে নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করা ঠিক না।” টুইটারে (এক্স) আরেক ব্যবহারকারী রিয়াদ করিম লিখেছেন, “সমস্যা পদত্যাগে নয়, সমস্যা স্বচ্ছতায়। কবে পদত্যাগ করেছেন, কেন হলফনামায় উল্লেখ নেই—এসব পরিষ্কার করা দরকার।”
এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়ন বৈধ রেখেছে। তবে আইনগত ব্যাখ্যার বিষয়টি সামনে আসায় ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরও তদন্ত বা পর্যালোচনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু একটি প্রার্থীর বিষয় নয়; বরং এটি দেশের নির্বাচনী আইনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
আন্না মিনজের প্রার্থিতা বৈধ কি না—তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ‘নির্বাহী পদ’-এর সংজ্ঞার ওপর। এটি কেবল আইনি ব্যাখ্যার প্রশ্ন নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নির্বাচনী নৈতিকতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। যতক্ষণ না বিষয়টি পরিষ্কার হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিতর্ক থামার সম্ভাবনা কম। বরং এটি নির্বাচনের আগে আরও বড় রাজনৈতিক আলোচনার ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন