ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তার পদত্যাগের পর যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো—এখন কি তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, নাকি তিনি আইনি দায়মুক্তির সুবিধা পাবেন? একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে আরেকটি হিসাব। সরকার কি এখনই তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেবে, নাকি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে?
গতকাল শুক্রবার পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি সংগঠন তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি কিংবা সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার বা মামলার মুখোমুখি করার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। এই নীরবতাকেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইবে না, যা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগকে শক্তিশালী করে। গত এক যুগের বেশি সময় ধরে বিরোধী দলগুলো যে অভিযোগ করে এসেছে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে—বর্তমান সরকার সেই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়তে চাইবে না। ফলে আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই মনে করা হচ্ছে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বিতর্কের অবসান হয়েছে। বরং তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব গ্রহণের আগের বিভিন্ন ভূমিকা এবং রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু নিয়েই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালনকালে নির্দিষ্ট ধরনের দায়মুক্তি দিয়েছে। ওই বিধান অনুযায়ী দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালানো বা গ্রেপ্তারের জন্য আদালতের পরোয়ানা জারি করা যায় না। তবে সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশের মত হলো, এই সুরক্ষা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর অন্য নাগরিকের মতো তিনিও প্রচলিত আইনের আওতায় আসতে পারেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়গুলো বিচার করতে গেলে আদালতকে সংবিধানের আরও কিছু বিধান বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে বিষয়টি সহজ নয়; প্রতিটি অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী আইনি মূল্যায়ন করতে হবে।
মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সংকটকাল। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সে সময় তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারতেন। অন্যদিকে তার সমর্থকেরা বলছেন, তিনি সাংবিধানিক সীমার মধ্যেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায়ও ভূমিকা রেখেছেন।
পদত্যাগপত্রেও তিনি সেই অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, সাংবিধানিক সংকটের সময় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তার দাবি, সে সময় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
এই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক বিতর্ক থামাতে পারেনি। এনসিপি ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে। খেলাফত মজলিসও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনের বাইরে কেউ নন। অর্থাৎ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বড় অংশ বিচার প্রশ্নটি সামনে রেখেই এগোতে চাইছে।
তবে রাজনৈতিক দাবি আর বিচারিক প্রক্রিয়া এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা বিচার শুরুর জন্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ এবং তদন্ত প্রয়োজন। কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করা যায় না। এ কারণেই আইনজ্ঞেরা বলছেন, ভবিষ্যতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হতে হবে।
মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে আরেকটি আলোচনার বিষয় তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কর্মকাণ্ড। তিনি একসময় দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন। পরে ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এস আলম গ্রুপের আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন তদন্ত ও মামলা চলমান। তবে এসব তদন্তে ব্যক্তিগতভাবে মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত কোনো অপরাধের রায় হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারের সামনে এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাদের জোটের কিছু রাজনৈতিক অংশীদার দ্রুত বিচার দাবি করছে। অন্যদিকে সরকার আন্তর্জাতিক মহলকে দেখাতে চাইবে যে, তারা আইনের শাসনের নীতি থেকে বিচ্যুত হচ্ছে না।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ রয়েছে, যেখানে ক্ষমতা ছাড়ার পর সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার পর দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। তবে প্রতিটি ঘটনার আইনগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। তাই সেই নজির সরাসরি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যায় না।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে রয়টার্স গত বছর মো. সাহাবুদ্দিনের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিল, যেখানে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা বলেছিলেন এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণেও দেশের সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। নতুন সরকার অর্থনীতি, নির্বাচন-পরবর্তী প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং বৈদেশিক সম্পর্কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এমন সময়ে সাবেক রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে কোনো সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মো. সাহাবুদ্দিনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানও আলোচনায় রয়েছে। তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন কি না, কিংবা কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে প্রকাশ্যে অবস্থান নেবেন কি না—এ বিষয়ে এখনো কিছু জানা যায়নি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি যদি সম্পূর্ণ নীরব থাকেন, তাহলে তাকে ঘিরে উত্তেজনাও ধীরে ধীরে কমতে পারে। বিপরীতে ভবিষ্যতে যদি তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তদন্ত শুরু হয় অথবা নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে।
সব মিলিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ একটি সাংবিধানিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও রাজনৈতিক বিতর্কের সমাপ্তি ঘটায়নি। আপাতত তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো সরকারি পদক্ষেপের ঘোষণা নেই। তবে বিরোধী দলগুলোর চাপ, সম্ভাব্য আইনি উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে বিষয়টি আগামী দিনগুলোতেও আলোচনার কেন্দ্রেই থাকবে। শেষ পর্যন্ত তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং তদন্তে উঠে আসা তথ্য, সংবিধানের ব্যাখ্যা এবং আদালতের সিদ্ধান্ত।
খবরটি শেয়ার করুন