শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** খুলনায় ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা *** মুঠোফোনের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা: পুলিশ *** পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত বেড়ে ৩১, ইত্তেহাদুল মুজাহিদিনের দায় স্বীকার *** রাজধানীতে মসজিদ থেকে আটক ২৩ জনের ১১ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ *** কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধার *** ‘তৃণমূলের নাম–প্রতীক কেড়ে নেওয়া বিজেপির নোংরা খেলা’, আদালতে মমতা *** সব জেলা পরিষদের স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক করতে সরকারের নির্দেশ *** বিধ্বস্ত পরমাণু স্থাপনা ফের নির্মাণ করছে ইরান *** ‘ছেলেরে কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে’—নিখোঁজ সন্তানের সন্ধান চেয়ে কুবি শিক্ষকের আহাজারি *** জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ, বদলে যাচ্ছে কি রাজনীতির সমীকরণ

সার্জিও গোরের ঢাকা সফরে যে লাভ-ক্ষতির হিসাব করছে আওয়ামী লীগ

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ০৮:৪১ অপরাহ্ন, ১লা আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: এআই

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের তিন দিনের ঢাকা সফরের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় সফরটিকে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নের চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা, দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিসেম্বরে সম্ভাব্য দেশে ফেরা এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী হতে পারে—এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে নানা ধরনের আলোচনা চলছে।

তবে এসব মূল্যায়নের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা সরকারি নিশ্চিতকরণ নেই। বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারতের কোনো সরকারই সার্জিও গোরের সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার বিষয় ছিল বলে জানায়নি। ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত রাজনৈতিক মূল্যায়ন, প্রত্যাশা ও বিভিন্ন কূটনৈতিক ইঙ্গিতের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে। কারো কারো মতে, দলীয় নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখার কৌশল হিসেবে এমন আলোচনা দলটির ভেতরে চলছে।

ভারতে অবস্থানরত দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের সময়কালকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তাদের যুক্তি, শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছার কথা জানানোর পরপরই এই উচ্চপর্যায়ের মার্কিন সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার ধারণা, সময়ের এই মিলকে পুরোপুরি কাকতালীয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

যদিও এই ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, তবু দলটির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত দলটির কয়েক নেতা মনে করছেন, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফরে আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচির বাইরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে মতবিনিময় হয়ে থাকে। সেই বিবেচনায় আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা কিংবা শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি সার্জিও গোরের সফরে কোনো না কোনো পর্যায়ে উত্থাপিত হয়ে থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সফরকালে সাংবাদিকদের স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের প্রশ্ন আলোচনায় আসেনি। সরকারের এই অবস্থানই এখন পর্যন্ত একমাত্র আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।

আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি অংশ অবশ্য মনে করছে, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকের সব বিষয় সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয় না। অনেক আলোচনা অনানুষ্ঠানিক বা সীমিত পরিসরে থেকে যায়। তবে এই ধারণাও কেবল তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; এর স্বপক্ষে কোনো প্রকাশ্য তথ্য নেই।

দলটির কয়েক নেতা সুখবর ডটকমকে বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সেই কারণে তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও আগ্রহী থাকতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় আরও একটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো, সার্জিও গোরের সফরের সময় ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে তার বৈঠক। বৈঠকটি নিয়ে প্রকাশ্যে খুব সীমিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা মনে করছেন, বাংলাদেশকে ঘিরে আঞ্চলিক কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে কোনো পক্ষই আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেনি।

ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও গত কয়েক সপ্তাহে প্রকাশিত কিছু বিশ্লেষণে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের সময়কালকে একই প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি বাংলা সংবাদমাধ্যম এবং দিল্লিভিত্তিক কিছু কৌশলগত বিশ্লেষণমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পরপরই কেন এই সফর অনুষ্ঠিত হলো। তবে এসব প্রতিবেদনেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এগুলো মূলত বিশ্লেষণ।

এসব বিশ্লেষণের কিছু অংশ আওয়ামী লীগের নিজেদের মূল্যায়নের সঙ্গে মিল রয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন। তবে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি অংশ আবার অতিরিক্ত প্রত্যাশা না রাখারও পরামর্শ দিচ্ছে।

দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত গ্রুপ, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এবং ইনবক্স আলোচনায় সার্জিও গোরের সফর নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সেখানে অনেকে সফরটিকে আওয়ামী লীগের জন্য সম্ভাব্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মহল হয়তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়োজনীয়তার দিকে গুরুত্ব দেবে।

আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা আরও মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যে বহুমুখী ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা চলছে, সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বিষয়। তাদের ব্যাখ্যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর ওয়াশিংটন বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আরও নিবিড়ভাবে নজর দিচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও সাংবাদিকদের বলেছেন, বৈঠকে তারেক রহমানের চীন সফর এবং বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা এটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে চীনের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ার বার্তা দিয়ে থাকতে পারে।

দলটির একটি অংশের ধারণা, একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী হতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের আলোচনায় প্রায়ই উল্লেখ করছেন যে, ভারতের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সে কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার যে কোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে তাদের জন্যও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সফরকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নিজস্ব মূল্যায়ন থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যখন কোনো দল ক্ষমতার বাইরে থাকে বা রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থাকে, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ঘটনাকে নিজেদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনার আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা যায়। আওয়ামী লীগের বর্তমান আলোচনাগুলোও সেই বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অন্যদিকে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করে, সার্জিও গোরের সফরের মূল গুরুত্ব ছিল বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

সব মিলিয়ে সার্জিও গোরের ঢাকা সফর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নতুন আশাবাদ, সতর্কতা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের জন্ম দিয়েছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক মহলের সম্ভাব্য দৃষ্টিভঙ্গি—এসব বিষয় নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সার্জিও গোর

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250