ফাইল ছবি
আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হওয়া মাওলানা ইকরামুল হক জামিনে মুক্তির পর প্রায় ২২ মাস ধরে নিখোঁজ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। সম্প্রতি ময়মনসিংহে তার গ্রামের বাড়িতেও খোঁজ নিয়েছেন গোয়েন্দারা। সেখান থেকে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইকরামুল হকের পরিবারের ভাষ্য, কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তিনি নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। তবে মাদ্রাসাটির নাম বা সঠিক অবস্থান তার পরিবারের সদস্যরাও জানেন না। ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসানও বলেছেন, ইকরামুলের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার কথা তারা শুনেছেন। তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
ইকরামুলের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন জাতিসংঘ আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার বাংলাদেশকেন্দ্রিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশ্লেষণ ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের ১০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদা বাংলাদেশে সক্রিয় ছোট ছোট সেল বা সাংগঠনিক ইউনিট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সংগঠনটি আগের তুলনায় ছড়িয়ে থাকা ছোট সেলের ওপর বেশি নির্ভর করছে এবং একই সঙ্গে অর্থ ও রসদ সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
ইকরামুল হকের বিষয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণেও আগেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের এক বিশ্লেষণে তাকে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার উপপ্রধান এবং প্রচার ও দাওয়াহ কার্যক্রমের দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশে সংগঠনটির সদস্য সংগ্রহ ও মতাদর্শ প্রচারে তার ভূমিকা ছিল।
দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইকরামুল হকের একাধিক ছদ্মনাম ছিল। আবু তালহা, মাওলানা সাবেত, নূর হোসেন, মনসুর ও মিলন—এসব নামে তিনি বিভিন্ন সময়ে পরিচিত ছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। ভারতে নূর হোসেন নামে একটি ভারতীয় পাসপোর্টও তিনি সংগ্রহ করেছিলেন বলে পুলিশের দাবি। সেই পরিচয়ে তার বাবার নাম দেওয়া হয়েছিল সাবু মিয়া এবং মায়ের নাম নাবিয়া বিবি। ঠিকানা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের দিনহাটা এলাকার কথা উল্লেখ ছিল। তার স্ত্রী ফারিয়া আফরিনও মরিয়ম খাতুন নামে ভারতের আধার পরিচয়পত্র করেছিলেন বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইকরামুলের জন্ম ময়মনসিংহের সদর উপজেলার বড়রচর এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ২০০৭ সালের হিফজ পরীক্ষায় সারাদেশে প্রথম হওয়ার তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পরে ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ২০১৭ সালে দাওরায়ে হাদিস শেষ করার পর পরের বছর ভারতে যান। উত্তর প্রদেশের দেওবন্দের দারুল উলুমে ভর্তি হন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতে পড়াশোনার সময়ই ইকরামুল আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। তিনি পরে সংগঠনটির সদস্য সংগ্রহ ও মতাদর্শ প্রচারের কাজে সক্রিয় হন। বাংলা, আরবি, উর্দু ও ইংরেজিতে তার দক্ষতা ছিল। কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কেও তার জ্ঞান ছিল বলে ওই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার কথাও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আল-কায়েদার সদস্যদের সংগঠিত করার কাজে তার ভূমিকা ছিল। ভারতের গুজরাটে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি তরুণ জিজ্ঞাসাবাদে ইকরামুলের মাধ্যমে সংগঠনটিতে যুক্ত হওয়ার কথা বলেছিলেন বলে আগের তদন্তে উঠে আসে। ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও তাকে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিল বলে ২০২৩ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ইকরামুল ২০২২ সালের দিকে অবৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। এরপর ময়মনসিংহ থেকে সংগঠনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। অনলাইনে সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশের দাবি। জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ভারতে বিভিন্ন এলাকায় আল-কায়েদার ছোট ছোট সেল গঠনে তার ভূমিকা ছিল এবং অনলাইনে সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও মতাদর্শগত শিক্ষা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালের ৩০ মে ঢাকার মাদারটেক এলাকা থেকে ইকরামুল ও তার স্ত্রী ফারিয়া আফরিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। ইকরামুলকে জিজ্ঞাসাবাদের পর কাশিমপুরের হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল। পরে তিনি ওই মামলায় জামিন পান। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর কারাগার থেকে বের হন বলে কারা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এরপর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা। পরিবারের দাবি, তিনি নারায়ণগঞ্জে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে গিয়ে তার অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। সম্প্রতি ময়মনসিংহের বড়রচরে তার পরিবারের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অন্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন গোয়েন্দারা। তাদের কাছ থেকেও ইকরামুলের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইকরামুলের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার কর্মকাণ্ড এখন শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় সংগঠনটি ছোট ছোট সেল এবং সীমান্তপারের যোগাযোগের ওপর জোর দিচ্ছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক বিশ্লেষণেও ইকরামুলকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আল-কায়েদার যোগাযোগ এবং সদস্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এ কারণে জামিনে মুক্তির পর ইকরামুলের অবস্থান শনাক্ত করতে না পারার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে তার বিরুদ্ধে থাকা গুরুতর অভিযোগ এবং ভারতেও তার বিরুদ্ধে মামলার তথ্য থাকায় বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর সঙ্গে সীমান্তপারের জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে।
জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা বাংলাদেশকে সম্ভাব্য কর্মকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। সংগঠনটি বড় সংগঠিত কাঠামোর পরিবর্তে ছড়িয়ে থাকা ছোট দল তৈরি করলে তাদের শনাক্ত করা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য আরও কঠিন হতে পারে।
ইকরামুলের সন্ধান না পাওয়ার ঘটনাটি তাই একজন জামিনে মুক্ত আসামির অবস্থান অজানা থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তার অতীত কর্মকাণ্ড, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ এবং আল-কায়েদার বর্তমান আঞ্চলিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান নিশ্চিত করা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন মূল প্রশ্ন, প্রায় দুই বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের বাইরে থাকা ইকরামুল আসলে কোথায় এবং তিনি বর্তমানে কোনো জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত আছেন কি না। এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ভর করবে তাকে খুঁজে বের করার পর তদন্ত কতটা এগোয় তার ওপর।
খবরটি শেয়ার করুন