ফাইল ছবি
ঢাকা থেকে দূরে ভারতের অবস্থান করছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতেই আছেন তিনি। প্রায় দুই বছর পর গত আগস্টে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। এরপর চলতি মাসে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য প্রিন্টকে সাক্ষাৎকার দেন তিনি।
এবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ওয়ানইন্ডিয়া নিউজের সাংবাদিক সিদ্ধান্ত সিবালকে দেওয়া লিখিত সাক্ষাৎকারে নিজের বর্তমান জীবন, দেশে ফেরার পরিকল্পনা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন শেখ হাসিনা।
ওয়ানইন্ডিয়া নিউজ আজ বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ‘হাসিনা সেজ শি রিডস ফাদার্স আনফিনিশড মেমোয়ার হোয়াইল প্ল্যানিং ঢাকা রিটার্ন’ শিরোনামে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে। এতে শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশ থেকে দূরে থাকা ‘কখনোই সহজ নয়’। বাংলাদেশ ‘প্রতিমুহূর্তে’ তার চিন্তায় রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার পরিকল্পনাও আবার জানিয়েছেন তিনি। তবে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও প্রবেশপথ এখনো ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন।
ভারতে বর্তমানে কীভাবে সময় কাটছে—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, বিভিন্ন প্রতিবেদন, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থনৈতিক হালনাগাদ তথ্য পড়েন তিনি। দেশের মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে যারা জানেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন। ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম নিয়ে লেখা বইও পড়েন।
এর মধ্যে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই দুটি তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’। বাবার দিনলিপিও পড়েন বলে জানিয়েছেন তিনি।
শেখ হাসিনার ভাষায়, এসব লেখা শুধু ব্যক্তিগত দলিল নয়। এগুলো সংগ্রাম, ত্যাগ, ধৈর্য ও মানুষের প্রতি বিশ্বাসের নথি। বাংলাদেশের জন্ম কেন হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধু কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, এসব লেখা তাকে তা মনে করিয়ে দেয়।
পড়াশোনাকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার উপায় হিসেবে দেখেন না শেখ হাসিনা। বরং তার ভাষায়, এটি প্রস্তুতির অংশ। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অর্থনৈতিক অবনতি, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন ও উগ্রবাদ থেকে দেশকে কীভাবে বের করে আনা যায়—এসব নিয়েই তিনি বেশি সময় ভাবেন বলে জানিয়েছেন।
দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, ডিসেম্বরেই ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করার পর্যায়ে যাননি। কারণ এর সঙ্গে শুধু রাজনীতি নয়, নিরাপত্তা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত।
দেশে ফেরাকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন না বলেও দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তার ভাষায়, এটি গণতন্ত্র, সাংবিধানিক সরকার এবং জনগণের স্বাধীনভাবে সরকার বেছে নেওয়ার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লাখো সমর্থক রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর থেকে বঞ্চিত হয়েছেন—তাদের প্রতি নিজের দায়িত্ব রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর আশঙ্কা আছে কি না—এ প্রশ্নেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি সচেতন। তবে জীবনের ওপর হুমকি তার জন্য নতুন নয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মা, তিন ভাইসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন দেশের বাইরে থাকায় তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। পরে দেশে ফিরে সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন, ষড়যন্ত্র, কারাবরণ ও একাধিক হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছেন বলেও দাবি করেন।
নিজের জীবনের ওপর অন্তত ১৯ বার হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে সবচেয়ে নৃশংস হিসেবে উল্লেখ করেন। ওই হামলায় ২৪ জন নিহত এবং ৩০০-এর বেশি মানুষ আহত হন। শেখ হাসিনাও আহত হয়েছিলেন। তার দাবি, ওই ঘটনায় তিনি এক কানের শ্রবণশক্তি হারান। দলীয় নেতা-কর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে তাকে রক্ষা করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
তবে এবার নিজের নিরাপত্তার চেয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংখ্যালঘু, নারী, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে শাস্তির মুখে পড়া মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। তার বক্তব্য, ভয় তার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা অবশ্য নতুন নয়। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যেও ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন তিনি। তখন তিনি গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকার কথাও বলেছিলেন।
গতকাল হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দেশে ফিরতে তার প্রত্যর্পণের প্রয়োজন নেই। নিজের দেশেই তিনি নিজে ফিরবেন। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য প্রিন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ওয়ানইন্ডিয়া নিউজের সাক্ষাৎকারেও একই ধরনের বক্তব্য এসেছে। তার অভিযোগ, দেশে গণতান্ত্রিক পরিসর বন্ধ, বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা এবং উগ্রপন্থী শক্তির পুনরুত্থানের কথাও বলেন তিনি।
অর্থনীতি নিয়েও বর্তমান সরকারের সমালোচনা করেছেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, তার সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছিল। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭৮৪ ডলার হয়েছিল। দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের হারও তার সরকারের সময়ে কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তার সরকারের সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট থেকে ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয়েছিল বলেও দাবি করেন।
স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ১৫ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো, শিক্ষা, নারীর অংশগ্রহণ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভূমিহীনদের আবাসন কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, ১৪৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল।
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক চাপের বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের চাপ এবং দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছিল।
শেখ হাসিনার দাবি করা অর্থনৈতিক সাফল্যের সব সূচকও তাঁর নিজের সময়ের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করে দেখা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের আকার ছিল প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার যে কয়েক বছরে বড় হয়েছে, সেটি তথ্যেও প্রতিফলিত হয়। তবে অর্থনীতির বর্তমান গতি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও আত্মবিশ্বাসী শেখ হাসিনা। তার দাবি, আওয়ামী লীগ এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে দলটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। কোনো নিষেধাজ্ঞা, মামলা বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মানুষের মন থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে দিতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনার দাবি, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলো জনগণের রায় পাওয়ার আগেই দলটিকে সরিয়ে দিয়েছে। তার আরও দাবি, বাংলাদেশের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিলে প্রায় ৬৩ শতাংশ ভোট পেতে পারত।
এই দাবির স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি বাস্তব। ২০২৫ সালের মে মাসে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। পরে দলটির নিবন্ধনও স্থগিত করা হয়। সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও দলটির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচারকে নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। আওয়ামী লীগ অবশ্য ওই সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। তার দাবি, ওই আন্দোলনকে শুধু স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখা যায় না। শুরুতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেও পরে এর লক্ষ্য বদলে যায় বলে তিনি মনে করেন। তার দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও জঙ্গি উপাদানসহ বিভিন্ন পক্ষ আন্দোলনকে সরকার পতনের দিকে নিয়ে যায়।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, তার সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেছিল। ২০১৮ সালে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের পর সরকার আপিল করেছিল এবং শিক্ষার্থীদের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
তার দাবি, ১৬ জুলাই ছাত্রলীগের কর্মী সবুজ আলী নিহত হওয়ার পর সহিংসতা আরও বাড়ে। সরকারি স্থাপনা, মেট্রোরেল ও থানায় হামলা, কারাগারে হামলা, অস্ত্র লুট এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোর কথাও তিনি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আন্দোলনে বাহ্যিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে আগের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত হওয়া দরকার।
২০২৪ সালের সহিংসতার ব্যাখ্যা নিয়ে অবশ্য আন্তর্জাতিক তদন্তে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তদন্তে বলা হয়, আন্দোলনের পেছনে শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভও কাজ করেছিল। একই প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের পাশাপাশি আন্দোলনের পর পুলিশ, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা দাবি করেন, তার সরকার ১৮ জুলাই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। পরে ১ আগস্ট কমিশন তিন সদস্যের করা হয়। তার বক্তব্য, তিনি সত্য প্রকাশের জন্যই তদন্ত চেয়েছিলেন। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই তদন্ত বন্ধ করে দেয় এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বয়ান তৈরি করে—এমন অভিযোগও করেছেন তিনি।
মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘ সমালোচনা করেছেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, ইউনূস আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেননি এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেননি। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করেছেন তিনি।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা ও সেটি ধ্বংসের ঘটনাকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও পরিচয়ের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন শেখ হাসিনা। তার অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক, মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইউনূসের ‘রিসেট বাটন’ বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন তিনি। তার ব্যাখ্যায়, এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে।
উগ্রবাদ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, দণ্ডিত ও অভিযুক্ত জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে বা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে যুক্ত কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরখাস্ত বা হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, তার সরকারের সময়ে টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে এক হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে। এই দাবিটির নির্দিষ্ট ভিত্তি বা সংখ্যাগত প্রমাণ সাক্ষাৎকারে তিনি দেননি।
ইউনূসের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা নিয়েও অভিযোগ করেছেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন, দুর্নীতি, করসহ বিভিন্ন মামলা প্রত্যাহার বা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার কর দায় বাতিল, গ্রামীণ ব্যাংকের পাঁচ বছরের কর অব্যাহতি এবং ব্যাংকে সরকারের অংশীদারত্ব ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার কথাও বলেন তিনি।
এ ছাড়া হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ প্রকল্প, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়, একটি ডিজিটাল ওয়ালেটের লাইসেন্স এবং জনশক্তি রপ্তানির অনুমোদনসহ ইউনূস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দ্রুত সুবিধা পেয়েছে বলে অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা। তার সহযোগী ও ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কের লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও করেন।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ইউনূসকে ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে—এ প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, নোবেল পুরস্কার দিয়ে তাকে বিচার করা হবে না। ক্ষমতায় থেকে তিনি কী করেছেন, ইতিহাস তার ভিত্তিতেই তাকে মূল্যায়ন করবে। তার মতে, ইউনূস বিদেশে শান্তির ভাবমূর্তি তৈরি করলেও দেশে শান্তি নষ্ট করেছেন এবং নিজের স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে এবং জনগণ নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধার করবে—এমন আশাবাদও জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তবে তার অভিযোগ, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, সেটি দেশের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, পাঁচ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর দীর্ঘ সময় সরকার পরিচালনার সময়ে অর্থনীতি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন তিনি।
তবে নিজের সরকারকে নিখুঁত দাবি করেননি শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, তার সরকারের ভুল ছিল, সমালোচনাও ছিল। ইতিহাস সেসবের বিচার করবে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিজামুদ্দিন দরগাহর কথাও এসেছে সাক্ষাৎকারে। ১৯৭৫ সালে পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর ভারত তাকে নিরাপত্তা, আশ্রয় ও মানবিকতা দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। দিল্লির নিজামুদ্দিন দরগাহ তার কাছে ব্যক্তিগত স্মৃতির জায়গা। সেখানে গেলে রাজনীতির জন্য নয়, পরিবারের সদস্যদের হারানো একজন কন্যা এবং প্রার্থনার মাধ্যমে শক্তি খোঁজা একজন মানুষ হিসেবে যান বলে জানিয়েছেন তিনি। দেশে ফেরার আগে আবার নিজামুদ্দিন দরগাহে যাবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাব অবশ্য দেননি শেখ হাসিনা।
সব মিলিয়ে ওয়ানইন্ডিয়া নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার বর্তমান জীবনযাপনের যে চিত্র উঠে এসেছে, সেখানে রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্মৃতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে বাবার লেখা বই পড়া, বাংলাদেশের খবর রাখা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার কথা বলেছেন তিনি। অন্যদিকে ডিসেম্বরের দেশে ফেরার পরিকল্পনা আবারও স্পষ্ট করেছেন।
তবে তার ফেরার পথ এখনো অনির্দিষ্ট। দেশে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৫ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি এসব বিচারকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাই ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে নিরাপত্তা, আইনি পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর। সম্প্রতি হিন্দুস্তান টাইমসকে শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি প্রত্যর্পণের মাধ্যমে নয়, নিজের ইচ্ছায় দেশে ফিরতে চান। দ্য প্রিন্টকেও তিনি ডিসেম্বরের ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
দুই বছর ধরে ভারতের মাটিতে থাকা শেখ হাসিনার নতুন সাক্ষাৎকারগুলোতে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি নিজেকে শুধু সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন না। বরং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নিজের দেশে ফেরার অধিকার এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ব্যাখ্যা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে আবারও দেশের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
খবরটি শেয়ার করুন