ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে গতকাল বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুটি ঘটনায় বিরোধী দলের অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের কাউকে না রাখা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত আটটি তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের সবগুলো সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের হওয়ায় আপত্তি তুলেছে বিরোধী দল। দুই ঘটনাতেই মূল প্রশ্ন উঠেছে সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা ও সরকারের জবাবদিহি নিয়ে।
বুধবার দিনের শেষ কার্যসূচিতে কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী আরও ১০টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির কোনো একটির সভাপতিও বিরোধী দলের সদস্যকে করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে অধিবেশনেই সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বিতর্ক হয়।
কমিটি গঠনের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বৈঠক মুলতবি ঘোষণা করতে গেলে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চান বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ মো. তাহের।
তাহের অভিযোগ করেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে কমিটির সদস্যপদ বণ্টন করা হলেও সভাপতির পদে সেই নীতি অনুসরণ করা হয়নি। সরকারি দলের সঙ্গে বৈঠকে বিরোধী দলকে ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সদস্যপদ বণ্টনের ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত মানা হয়েছে। কিন্তু সভাপতির পদে তা করা হয়নি।
তাহের বলেন, একপর্যায়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে ১০টি সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ জন্য বিরোধী দলের কাছ থেকে তালিকাও নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, সভাপতির পদেও বিরোধী দল ২৬ শতাংশ পাওয়ার আশা করেছিল। এটি তাদের অধিকার। তবে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সভাপতি কোন দল থেকে কতজন হবেন, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট অনুপাত নেই।
সরকারি দলের আচরণে বিরোধী দলের সংসদে থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তাহের। তার অভিযোগ, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সরকারি দল কিছুটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছাই যদি সংসদের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, তাহলে তা স্বৈরাচারী আচরণে পরিণত হতে পারে। দেশের স্বার্থ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সংসদে এবং সংসদের বাইরে বৈষম্য না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
একই নীতিতে ভবিষ্যতে সংসদীয় কমিটি গঠন করা হলে বিরোধী দল সংসদে নাও থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। সভাপতির পদ না দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হলে তাদের কথা শোনার জন্য বিরোধী দল সংসদে নাও থাকতে পারে। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের আসনসংখ্যার অনুপাতে দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অতীতেও এ ধরনের কোনো রীতি ছিল না।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতি করার বিষয়ে সরকারি দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। তবে জুলাই জাতীয় সনদে সংসদীয় চর্চায় মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিতে আসনের অনুপাতে বিরোধী দলের সদস্যদের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধনের পর সংসদীয় কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। তখন আসনের অনুপাতে বিরোধী দল সভাপতির পদ পাবে। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিরোধী দল সহযোগিতা করছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা যেন সংসদের বাইরে রাজনীতি না করে সংসদে এসে কথা বলেন। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায়ও বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বুধবার গঠিত ১০টি কমিটির মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন শিক্ষক নেতা সেলিম ভূঁইয়া। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন সেলিমা রহমান।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন হুইপ রকিবুল ইসলাম। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন কলিম উদ্দিন আহমেদ।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি আমানউল্লাহ আমান। পরিবেশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হুইপ জি কে গউছ। ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি নাসের রহমান এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জামাল।
জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ-সম্পর্কিত। বুধবারের ১০টি কমিটি নিয়ে এ পর্যন্ত ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি। সংসদ-সম্পর্কিত একটি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধীদলীয় উপনেতাকে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বুধবার সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব নিয়েও বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত আটটি তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের সবগুলোই ছিল সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরুর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি তোলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন জমা দেন। কিন্তু বুধবারের আটটি তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের একটিও তাদের ছিল না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা যত বেশি প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন, সরকারের জবাবদিহির সংস্কৃতি তত শক্ত হবে। এ বিষয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি পরবর্তী সময়ে বিবেচনা করা হবে।
সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রশ্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের জন্য আলাদা কোনো পদ্ধতি নেই। নিয়ম অনুযায়ী, যিনি আগে প্রশ্ন জমা দেবেন, তিনি আগে সুযোগ পাবেন।
বিরোধী দলের সদস্যরা প্রশ্ন জমা দিতে পিছিয়ে পড়লে সেটি তাদের অসুবিধা বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা যাতে প্রশ্ন করার সুযোগ পান, সেদিকে স্পিকারের দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ জানান।
স্পিকারও প্রশ্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিয়মের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগে এলে আগে নেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
এ সময় তিনি অতীতে প্রশ্ন জমা দেওয়া নিয়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার একটি উদাহরণ দেন। স্পিকার বলেন, বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল একসময় বিছানাপত্র নিয়ে আগের রাতেই প্রশ্ন জমা দেওয়ার অফিসের সামনে অবস্থান নিতেন। আরও দু-একজন সদস্যও আগের রাতে সেখানে শুয়ে থাকতেন।
কোনো কোনো সংসদ সদস্য তাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের আগেই প্রশ্ন জমা দেওয়ার জন্য লাইনে পাঠাতেন বলেও জানান স্পিকার। তবে সংসদ সদস্য এসে ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হতো। সংসদ সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো বলে জানান তিনি।
প্রশ্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে তুমুল প্রতিযোগিতা হয় উল্লেখ করে স্পিকার বিরোধী দলের সদস্যদেরও আগে প্রশ্ন জমা দেওয়ার চেষ্টা করতে বলেন। একই সঙ্গে বিরোধী দলের প্রশ্ন করার সুযোগের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন তিনি।
কমিটি গঠন নিয়ে বিতর্কের একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্যের পর বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। তবে এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইয়েদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা অধিবেশন কক্ষে ছিলেন।
একই দিনে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি সংসদে সরকারের জবাবদিহি ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিরোধী দল যেখানে সংসদে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি করছে, সেখানে সরকার বলছে, বিদ্যমান নিয়ম মেনেই সংসদীয় কার্যক্রম চলছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পর কমিটির কাঠামোয় পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন