ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই জোটের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে সৌদি আরব। তবে এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত কিছু জটিল প্রশ্নও। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের সামনে কার্যত উভয় সংকট। জোটে যোগ দিলে ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতার ঝুঁকি রয়েছে। আবার জোট থেকে দূরে থাকলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কেও পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। সৌদি গণমাধ্যম আরব নিউজ-এর তথ্য অনুযায়ী, ৫১টি দেশকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবসহ ১৪টি দেশ এই জোটে যুক্ত হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, জর্ডান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও নাইজেরিয়া। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে অংশ নেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান।
সৌদি আরব বলছে, এই জোট সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। কোনো রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে এটি গঠন করা হয়নি। মূল কাজ হবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, সমন্বিত টহল এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, বাস্তবে এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন লোহিত সাগরে নিরাপত্তা সংকট, ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই জোটে যোগ দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপমুখী পণ্যবাহী জাহাজের বড় অংশ বাব আল-মানদেব প্রণালি ও লোহিত সাগর ব্যবহার করে। এই পথে অস্থিরতা তৈরি হলে আমদানি-রপ্তানির ব্যয় বাড়ে। জ্বালানি সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করে, এটি শুধু সামরিক উদ্যোগ নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশল। ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোস্তফা কামাল রুশো বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। এটিকে কেবল জোট রাজনীতির দৃষ্টিতে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না।
তবে অন্য অংশের বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে "সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়" নীতির কথা বলে এসেছে। সেই অবস্থান থেকে কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্ন তৈরি করবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান মনে করেন, বাংলাদেশ অতীতে কোনো প্রতিরক্ষা জোটের সক্রিয় সদস্য ছিল না। তাই এই জোটে অংশ নেওয়ার ধরন, দায়িত্ব এবং সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তার মতে, এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়, যাতে বাংলাদেশ সরাসরি কোনো আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ইরান। সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছে, তবু আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়নি। এই অবস্থায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ তেহরান কীভাবে নেবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের উচিত পরিষ্কারভাবে জানানো যে, এই জোটে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অবস্থান নয়। তা না হলে ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা কিংবা রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জে ইউ ভুঁইয়া মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত একদিন শেষ হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে। তার মতে, ইরান ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে গেলে বাংলাদেশের বর্তমান সিদ্ধান্ত তাদের মূল্যায়নের অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, এই জোট জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন নয়। ফলে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ড. নাসির উদ্দিন আহমেদও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, যদি বাংলাদেশের নৌ সদস্যরা সংঘাতপ্রবণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আগে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। অতীতে উপসাগরীয় অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তার উদাহরণ থাকলেও এবার সেই ধরনের নিরাপত্তা কাঠামো থাকবে কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে নতুন এই জোটকে ঘিরে ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত সরাসরি এই জোটের সদস্য না হলেও ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তাকে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ফলে বাংলাদেশের নতুন অবস্থান নয়াদিল্লি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে চীনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ এই নৌপথ দিয়েই যায়। ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা বেইজিংয়েরও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানি বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। পণ্য পৌঁছাতে সময়ও বেশি লেগেছে। এর প্রভাব বিশ্ববাজারের পাশাপাশি আমদানি-নির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতেও পড়েছে। বাংলাদেশও সেই প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।
বাংলাদেশ এর আগে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি সামরিক জোটে যোগ দিয়েছিল। তবে সেই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। রিয়াদে পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিদলও পাঠানো হয়নি। এবার নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে এই অংশগ্রহণ কেবল সমন্বয় ও তথ্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে যৌথ মহড়া বা টহলেও বিস্তৃত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কেবল আদর্শিক অবস্থান ধরে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও জাতীয় স্বার্থ এখন পররাষ্ট্রনীতির বড় নিয়ামক। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশও হয়তো আরও বাস্তবভিত্তিক নীতির দিকে এগোচ্ছে। তবে সেই পথে হাঁটতে গিয়ে যেন কোনো একটি শক্তি বলয়ের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে দেখা না হয়, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
সামগ্রিকভাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ একদিকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে এটি নতুন কূটনৈতিক সমীকরণও সৃষ্টি করেছে। একদিকে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষা বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই জোটে বাংলাদেশের ভূমিকা, দায়িত্ব ও সীমা সম্পর্কে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে।
একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, দেশের অংশগ্রহণ যেন কেবল আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে এবং কোনো আঞ্চলিক সংঘাতের পক্ষ হিসেবে বাংলাদেশকে যেন দেখা না হয়। এমন ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই নতুন এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য সুযোগে পরিণত হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন