সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার *** সমালোচনার মুখে হাফেজদের উপহার দেওয়া সেই বই ফেরত নিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী *** অপ্রতিমের মা ড. নাহিদার চব্বিশের সেই ফেসবুক পোস্ট কেন আলোচনায়, কী লিখেছিলেন তিনি *** পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে রক্ষা করতে যুদ্ধে জড়াবে

ইতালীয় সাংবাদিকের বিশ্লেষণে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরা

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০২:৪২ পূর্বাহ্ন, ৩রা আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা, তাকে ঘিরে ভারতের অবস্থান এবং এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পুরস্কারপ্রাপ্ত ইতালীয় সম্প্রচার সাংবাদিক সিমোনেত্তা ফরনাসিয়েরো।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমস-এ প্রকাশিত ‘হাসিনাস রিটার্ন ফ্রম ইন্ডিয়া উড ইম্পেরিল বাংলাদেশস সভরেনটি’ (ভারত থেকে হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলবে) শিরোনামের নিবন্ধে তিনি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ আবেদন, ভারতের ভূমিকা এবং দুই দেশের সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

নিবন্ধে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যও উদ্ধৃত করেছেন। তবে নিবন্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন দাবি, অভিযোগ ও মূল্যায়ন লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে।

সিমোনেত্তা ফরনাসিয়েরো নিবন্ধের শুরুতেই বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তিনি লিখেছেন, "রাজনৈতিক বিচারে শেখ হাসিনা যে অপমানজনক পরিস্থিতিতে ক্ষমতা ছাড়েন, তাকে শুধু ‘অপসারণ’ বললে তা কম বলা হবে।"

তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বিরোধী মতের ওপর কঠোর অবস্থান এবং নাগরিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, অনেক বাংলাদেশির কাছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে, ওই আন্দোলন ছিল ভয়, পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান।

নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন যে তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরতে চান। এ প্রসঙ্গে ফরনাসিয়েরো লিখেছেন, "আসল প্রশ্ন তিনি ফিরবেন কি না—সেটি নয়; বরং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে, এমন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কীভাবে ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছেন, সেটিই মূল প্রশ্ন।"

তিনি লেখেন, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়েছে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে আবেদন পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হলেও তা এখনো আইনগত বিবেচনাধীন বলে জানানো হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ইতালীয় সাংবাদিক। তার ভাষায়, কোনো দেশ রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু আশ্রয় দেওয়া এবং নিজ দেশের আদালতে দণ্ডিত একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে সেই দেশের বিচারব্যবস্থার আওতার বাইরে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া—দুই বিষয় এক নয়। তিনি উল্লেখ করেন, এ ক্ষেত্রে আইন বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথা বলছেন।

নিবন্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা টোবি ক্যাডম্যানের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, "আমি বারবার ভারতকে প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছি। ভারত সেই আহ্বান উপেক্ষা করেছে। আমার মতে, চুক্তিতে উল্লেখিত কোনো কারণেই প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ ছিল না। কিন্তু ভারত তা না করায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়েছে।"

একই সঙ্গে ক্যাডম্যানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে ফরনাসিয়েরো লিখেছেন, "বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, আইন ও নাগরিকদের মাধ্যমে; প্রতিবেশী দেশের সুরক্ষায় নির্বাসন থেকে পরিচালিত রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে নয়।"

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে ফরনাসিয়েরো একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেছেন। তার বিশ্লেষণে বলা হয়, ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাস। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে। ফলে এই সময় দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। তার ভাষায়, "ডিসেম্বরকে বেছে নেওয়া নিছক কাকতালীয় নয়; এটি অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে নেওয়া একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ।"

তিনি দাবি করেন, এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে একজন অভিযুক্ত সাবেক শাসকের প্রত্যাবর্তনের বদলে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলের নেত্রীর প্রত্যাবর্তন হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা হতে পারে।

ফরনাসিয়েরো আরও লিখেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার বা কারাবরণ করলে তার সমর্থকেরা তাকে রাজনৈতিক শহীদ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, কয়েক মাস আগেই দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার ফলে সরকারকে নিরাপত্তা, সম্ভাব্য রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, "ছয় মাস আগে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা নিশ্চিত করতে চাইছেন, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনা তার, তার দল এবং তার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।" ফরনাসিয়েরোর মতে, আলী রিয়াজ এই ঘোষণাকে "সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনার ঘোষণার পর বাংলাদেশের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম পুনর্ব্যক্ত করেন যে তিনি দেশে ফিরলে তাকে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার করা হবে। তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, "আপনি ডিসেম্বরে আসবেন না জানুয়ারিতে আসবেন, সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমরা চাই আপনি আগামীকালই আসুন।"

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও বিশ্লেষণ করেছেন ফরনাসিয়েরো। তার মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, যোগাযোগ ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছিল। এর ফলে নয়াদিল্লির প্রভাবও বেড়েছিল। তিনি লিখেছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে।

তার দাবি, শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি এখন কেবল আইনি প্রশ্ন নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বিষয়েও পরিণত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশ প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে এবং ভারত তা বিবেচনা করছে বলে জানালেও, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকায় বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে—এমন প্রশ্ন উঠছে।

তবে ফরনাসিয়েরো একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, "এ পর্যন্ত এমন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই যে নয়াদিল্লি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করছে।" কিন্তু তার দাবি, তাকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ দেওয়া ভারতের হাতে একটি রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্র তৈরি করছে।

এ প্রসঙ্গে আলী রিয়াজের আরেকটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, "ভারত সরকার যদি তাকে বাংলাদেশে পাঠাতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে এই আলোচনা মূলত বাংলাদেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির একটি রাজনৈতিক কৌশল।"

পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেন, "বাংলাদেশ বদলে গেছে। শুধু সরকার বদলায়নি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান মানুষের ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিয়েছে। ভারত যদি তার নীতি পুনর্বিবেচনা না করে, তাহলে তারা আবারও বড় ভুল করবে।"

নিবন্ধের শেষাংশে সিমোনেত্তা ফরনাসিয়েরো লিখেছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তবে তার মতে, বড় প্রশ্ন হলো—ভারত একই সঙ্গে একজন সাবেক শাসককে আশ্রয়, সুরক্ষা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দিয়ে নিজেকে কতটা নিরপেক্ষ অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে।

তিনি লিখেছেন, "বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত ঢাকায়, নির্বাসন থেকে নয়।" একই সঙ্গে আলী রিয়াজের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, "বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে হতে হবে। বাংলাদেশিদের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে ভারত প্রতিবেশীদের সঙ্গে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে, অসম সম্পর্ক চায়। সেই ধারণা বদলাতে হবে।"

নিবন্ধের উপসংহারে ফরনাসিয়েরো মন্তব্য করেন, ভারত যদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বার্তা দিতে চায়, তাহলে শেখ হাসিনাকে ঘিরে তাদের অবস্থানও এমন হতে হবে, যাতে তা পারস্পরিক সম্মান ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যথায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে—এমন মন্তব্য করেছেন ইতালীয় এই সাংবাদিক।

শেখ হাসিনা সাংবাদিক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250