সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: বাসস
রাজধানীর কাকরাইলে সনাতন ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৪৬টি সংগঠনের প্রতিনিধি অশোক তরু সাহা। তার অভিযোগ, সম্প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে হারে নির্যাতন বেড়েছে, তা যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। তিনি অবিলম্বে সরকারকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ও বিশেষ ভূমিকা নেওয়ার দাবি জানান।
আজ শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন অশোক তরু সাহা। সম্মিলিত সনাতন পরিষদ এ আয়োজন করে।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, ময়মনসিংহ–৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ। সভা সঞ্চালনা করেন সম্মিলিত সনাতন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার আচার্য এবং সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস।
মূল বক্তব্যে অশোক তরু সাহা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের ঘটনা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এসব ঘটনার কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মতবিনিময় সভায় সম্মিলিত সনাতন পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা, হিন্দুধর্মীয় উৎসবগুলোয় প্রয়োজনীয় সরকারি ছুটি দেওয়া, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে সরকারি জায়গা বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান এবং ট্রাস্টটিকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তর করা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্মীয় অধিকারসহ সব নাগরিকের অধিকারই সুরক্ষিত হবে। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে না পারা। গণতন্ত্র থাকলে নাগরিকের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় ও সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত থাকত।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি সব সময় একটা কথা বলি, যারা একাত্তরকে ভুলে যেতে চায় বা ভুলিয়ে দিতে চায়, তারা কখনো বাংলাদেশে বিশ্বাস করে না। কারণ, বাংলাদেশে বিশ্বাস করতে হলে আমাদের অবশ্যই একাত্তরকে সামনে আনতে হবে।’ তবে তিনি বলেন, একাত্তরকে সামনে আনার অর্থ চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানকে পেছনে ফেলে দেওয়া নয়। তার ভাষায়, জুলাই আন্দোলনকেও অস্বীকার করা যায় না, কারণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন এবং একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছেন। বিএনপি একাত্তর ও চব্বিশ—কোনোটিকেই ছোট করে দেখে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, একটি গোষ্ঠী সচেতনভাবে ধর্মের নামে দেশকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দিতে চায়। এ ধরনের অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। আমরা এখানে উদারপন্থী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। বিএনপি কাউকে সংখ্যালঘু মনে করে না। দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবস্থানের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি কখনো তাদের সংখ্যালঘু হিসেবে দেখতেন না; বরং এই দেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতেন। নিজের অধিকার আদায়ে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, সভায় যেসব বিষয় উত্থাপিত হয়েছে, তার অধিকাংশই বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগের সময়ের ঘটনা। তার দাবি, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সব ধর্মের মানুষের জীবন, সম্পদ ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় সচেতনভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী, রথযাত্রাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরকার ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, সরকারের উদ্দেশ্য হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নিরাপদ বোধ করেন।
তিনি আরও বলেন, অতীতের নির্যাতনের প্রসঙ্গ বারবার টেনে আনলে সামনে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কোনোভাবেই উগ্রবাদ ও মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে দল ও ভবিষ্যৎ সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে। এ জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পেছনে সংখ্যালঘুদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিষয়টি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। সরকারের কাছে দেশের সব নাগরিক সমান এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণে পক্ষপাত না করে নিরপেক্ষ ও সঠিক তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন। কেবল সাম্প্রতিক এক–দুই বছরের ঘটনা নয়, বরং সামগ্রিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, কোনো অপরাধকে কেবল নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন হিসেবে না দেখে সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের মধ্যে গরমিল থাকলে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সভার শেষ দিকে সম্মিলিত সনাতন পরিষদের নেতারা সরকারের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তারা।
খবরটি শেয়ার করুন