ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গত শনিবার (১৫ই নভেম্বর) ৯০ বছর পূর্ণ করেছেন। দুই দশক ধরে পশ্চিম তীরে সীমিত কিছু এলাকায় তার নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ইসরায়েলের চাপ, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় তিনি এখন রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন। গাজা যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজের ভূমিকা বজায় রাখতেও লড়াই করছেন তিনি। খবর এপির।
বিশ্বে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে আব্বাসের বয়স দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০৫ সালে ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর তিনি নির্বাচিত হন। তখন অনেকে আশা করেছিলেন, তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু তা এখনো সম্ভব হয়নি। তাছাড়া তার পুরো সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে ফিলিস্তিনিরা কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছেন বলে অনেকেই সমালোচনা করে থাকেন।
এরই মধ্যে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গাজাকে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করেছে। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এ অভিযানে গণহত্যা ঘটেছে। বহু আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনও একই মত দিয়েছে। ইসরায়েল এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বরং ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরো কড়াকড়ি হয়েছে। দখলদার এলাকায় বসতি বৃদ্ধি এবং ইহুদি বসতকারীদের হামলাও বেড়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সহযোগীরা এলাকাটি পুরোপুরি দখল বা সংযুক্ত করার দাবি তুলছেন।
গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধোত্তর গাজা শাসনে আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে। এখন সেখানে কার্যকর কোনো নেতৃত্ব না থাকায় আন্তর্জাতিক শক্তিধর দেশগুলোকে কেন্দ্র করে একটি নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিদের ভূমিকা খুব সীমিত হয়ে যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
ফিলিস্তিনি জরিপ সংস্থা পিপলস কোম্পানি ফর পোলস অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের প্রধান খালিল শিকাকি বলেন, ‘তার বৈধতা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তিনি এখন নিজের দল ও পুরো ফিলিস্তিনিদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।’
পশ্চিম তীরের যে অংশগুলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানেও দুর্নীতির অভিযোগ ব্যাপক। আব্বাস খুব কমই রামাল্লাহর কার্যালয় ছেড়ে বাইরে যান। সব সিদ্ধান্তও তার ঘনিষ্ঠ মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি এপ্রিলে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী হুসেইন আল-শেইখকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেন।
শিকাকির প্রতিষ্ঠানের অক্টোবরে জরিপে দেখা গেছে, ওয়েস্ট ব্যাংক ও গাজার ৮০ শতাংশ মানুষ আব্বাসের পদত্যাগ চান। মাত্র এক-তৃতীয়াংশ গাজা শাসনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ বা আংশিক ভূমিকা চান। জরিপে ১ হাজার ২০০ জন অংশ নেন।
তবে আব্বাস সমালোচনার মধ্যেও কিছু সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। যুদ্ধ শেষে এক বছরের মধ্যে আইনসভা ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে বৈঠকে নতুন সংবিধান প্রণয়নে যৌথ কমিশন গঠনের কথাও জানান। দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে অক্টোবর মাসে পরিবহনমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে তদন্ত শুরু হয়।
তবে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সন্দেহ এখনো গভীর। তারা মনে করেন যে, নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি আগেও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। সাম্প্রতিক জরিপ ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, এখনই নির্বাচন হলে আব্বাস তৃতীয় স্থানে থাকবেন। ফাতাহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতা মারওয়ান বারঘুতি সবচেয়ে এগিয়ে থাকবেন। তিনি ২০০২ সাল থেকে ইসরায়েলে কারাবন্দী।
বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করেই রাখতে চাচ্ছে ইসরায়েল। এতে গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাংককে একীভূত করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন