ফাইল ছবি
স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ছাড়া কেউ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করতে পারে না—এমন মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনিস আলমগীর। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে ঘটনাকে প্রথমে বিক্ষুব্ধ জনতার ক্ষোভ হিসেবে দেখা হয়েছিল, বাস্তবে তা ছিল পরিকল্পিত এবং এর পেছনে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী একটি সংগঠিত চক্র।
গতকাল রোববার (৩ মে) একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে অংশ নিয়ে আনিস আলমগীর বলেন, ঘটনাস্থলের কাছেই তার বাসা হওয়ায় তিনি সরাসরি পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সামাজিক মাধ্যমে লাইভও করেছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের আচরণ, স্লোগান এবং পারস্পরিক কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট ছিল যে তারা সাধারণ ক্ষুব্ধ জনতা নয়। “আমি দেখেছি তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ‘হ্যাপি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’ বলছে। আমাদের স্বাধীনতা দিবস তো ১৬ ডিসেম্বর। তাহলে এই নতুন ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’ কোথা থেকে এলো?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার মতে, এই ধরনের বক্তব্য ও আচরণ থেকেই বোঝা যায় যে সেখানে উপস্থিতদের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। তিনি আরও বলেন, ওই সময় বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে থাকা ভাস্কর্য, স্মৃতিচিহ্ন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়েছে। “এটা শুধু একটি বাড়িতে হামলা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আঘাত করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা,” বলেন তিনি।
আনিস আলমগীরের বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও উঠে আসে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ৫ আগস্টের ঘটনাটি কি শুধুই একটি সরকার পতনের আন্দোলনের অংশ ছিল, নাকি এর পেছনে মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার একটি সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য কাজ করেছে। তিনি বলেন, “যদি এটা শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের বিষয় হতো, তাহলে কেন মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো লক্ষ্যবস্তু হলো?”
তিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন। বিশেষ করে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে আবার হামলা ও ভাঙচুর হয়, তখন সরকার কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। “ঘোষণা দিয়ে ভাঙা হয়েছে, কিন্তু সরকার চুপ থেকেছে। এমনকি সরকারের কিছু সদস্য এ ঘটনাকে উৎসাহিত করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে,” বলেন তিনি।
তার ভাষায়, এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে মনে হয়েছে যে সরকার স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি। “আমি বলবো না যে তিনি (ইউনূস) ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করেছেন, তবে তিনি একটি চক্রের প্রভাবের মধ্যে পড়ে গেছেন এবং তাদের মতো করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন,” মন্তব্য করেন আনিস আলমগীর। তিনি এটিকে দেশের জন্য একটি “দুঃসহ সময়” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
এদিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি, যা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত, সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ঘটনাটির সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল ছিল এবং হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে তাণ্ডব চালায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠে।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই এটিকে দেশের ইতিহাস ও চেতনার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন।
ঢাকার বাসিন্দা মাহবুব রশীদ লিখেছেন, “ধানমন্ডি ৩২ শুধু একটি বাড়ি নয়, এটি আমাদের ইতিহাসের অংশ। এখানে হামলা মানে আমাদের অস্তিত্বে আঘাত।” অপরদিকে, চট্টগ্রামের সুমাইয়া তাসনিম বলেন, “যারা এসব করেছে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাসকে ব্যবহার করছে। এর বিচার হওয়া উচিত।”
আবার কেউ কেউ ঘটনাটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক অস্থিরতার অংশ হিসেবে দেখছেন। রাজশাহীর আরিফুল ইসলাম নামে একজন লেখেন, “এই ধরনের ঘটনা হঠাৎ ঘটে না। এর পেছনে সংগঠিত পরিকল্পনা থাকে, যা তদন্তের মাধ্যমে বের করা দরকার।”
বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। তাদের মতে, কোনো জাতির ইতিহাস ও প্রতীকগুলো যখন আক্রমণের শিকার হয়, তখন তা কেবল ভাঙচুর নয়—এটি একটি মতাদর্শগত সংঘর্ষের বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি, না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত স্থান ও স্মৃতিচিহ্নগুলোকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সার্বিকভাবে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনায় উঠে আসা প্রশ্নগুলো এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি। এটি কি শুধুই একটি রাজনৈতিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে গভীরতর কোনো মতাদর্শগত সংঘাত কাজ করছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে দেশবাসী।
খবরটি শেয়ার করুন