ছবি: সংগৃহীত
ঈদুল আজহা সামনে এলেই কোরবানির প্রস্তুতি শুরু হয় ঘরে ঘরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কোরবানির ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় পশুর হাটে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে গরু বা ছাগল পছন্দ করা, দরদাম করা এবং পরে বাড়িতে এনে যত্ন নেওয়াই ছিল প্রচলিত চিত্র। এখন সেই দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন বাস্তবতা—অনলাইনভিত্তিক কোরবানি সেবা।
বিশেষ করে শহুরে ব্যস্ত জীবন, যানজট, সময়সংকট এবং বিদেশে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অনলাইনে কোরবানির পশু কেনা এবং ভাগে কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
দেশের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও প্রতিষ্ঠান এখন শুধু পশু বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা পশু নির্বাচন, জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে দরিদ্র মানুষের মধ্যে মাংস বিতরণের দায়িত্বও নিচ্ছে। ফলে অনেকের কাছে এটি একটি সহজ ও সময় সাশ্রয়ী ব্যবস্থা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নও উঠছে—এই আধুনিক ব্যবস্থায় দেওয়া কোরবানি শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য?
ইসলামি চিন্তাবিদেরা বলছেন, কোরবানির মৌলিক বিধান ও শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ করা হলে অনলাইন বা অফলাইন—পদ্ধতি ভিন্ন হলেও কোরবানির বৈধতায় কোনো সমস্যা নেই। ইসলাম মানুষের জন্য সহজতা চায়। কিন্তু সহজতার নামে যদি কোরবানির মৌলিক শর্ত উপেক্ষা করা হয়, তাহলে সেই ইবাদতের উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফিকহশাস্ত্রে অন্য কাউকে নিজের পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে বলা হয় ‘ওয়াকালাহ’ বা প্রতিনিধিত্ব। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি নিজে কোরবানি করতে না পারেন, তাহলে তিনি অন্য কাউকে তার প্রতিনিধি করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে প্রতিনিধি তার পক্ষ থেকে পশু ক্রয়, জবাই কিংবা অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি বৈধ।
বর্তমানে অনলাইন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত এই প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতেই কাজ করে। একজন ক্রেতা অর্থ প্রদান করেন, আর প্রতিষ্ঠানটি তার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে। শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানটি যদি বিশ্বস্ত হয় এবং দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে এতে আপত্তির সুযোগ নেই।
বিশেষ করে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বহু বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। তাদের অনেকের পক্ষে দেশে এসে কোরবানি করা সম্ভব হয় না। ফলে তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা পরিচিত কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে দেশে কোরবানি সম্পন্ন করেন। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার দাবি করে, তারা কোরবানির গোশত গরিব মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে। ইসলামি দৃষ্টিতে এটি একটি আমানতের দায়িত্ব। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানকে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
অন্যদিকে ভাগে কোরবানি দেওয়ার বিষয়টিও এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গরুর দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এককভাবে গরু কোরবানি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে একটি গরু সাত ভাগে ভাগ করে সাত ব্যক্তি মিলে কোরবানি করার প্রবণতা বেড়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে সাতজন ক্রেতার জন্য আলাদা অংশ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, গরু, মহিষ ও উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত ব্যক্তি অংশীদার হতে পারেন। তবে শুধু অংশীদার হলেই হবে না; প্রত্যেকের নিয়ত হতে হবে ইবাদতের। যদি কারও উদ্দেশ্য শুধুই মাংস সংগ্রহ হয় এবং কোরবানির ইবাদতের নিয়ত না থাকে, তাহলে পুরো কোরবানিই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে ইসলামি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
তবে অনলাইন কোরবানির ক্ষেত্রে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। বিভিন্ন সময় অভিযোগ ওঠে, পশুর প্রকৃত বয়স গোপন করা হচ্ছে কিংবা ত্রুটিযুক্ত পশু কোরবানি দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে প্রদর্শিত পশু এবং বাস্তবে জবাই করা পশুর মধ্যে মিল না থাকার অভিযোগও এসেছে।
ইসলামে কোরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স রয়েছে। গরু বা মহিষের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই বছর এবং ছাগলের ক্ষেত্রে এক বছর পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পশু হতে হবে বড় ধরনের শারীরিক ত্রুটিমুক্ত। অন্ধ, মারাত্মক অসুস্থ, স্পষ্টভাবে খোঁড়া বা অত্যন্ত দুর্বল পশু কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
কোরবানির সময়সীমাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঈদের নামাজের আগে পশু জবাই করলে তা কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাই করতে হবে। অনলাইন সেবার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বর্তায়।
ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় বিষয় হওয়ার পাশাপাশি এটি একটি অর্থনৈতিক লেনদেনও। ফলে ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির অতীত কার্যক্রম, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সেবার মান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ভিডিও কল, ভিডিও রেকর্ডিং বা লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে কোরবানির প্রক্রিয়া দেখানোর সুবিধা দিচ্ছে। এতে স্বচ্ছতা কিছুটা বাড়ছে।
এ ছাড়া কোরবানির পশুর ভাগ, চামড়ার ব্যবহার, কসাইয়ের পারিশ্রমিক এবং মাংস বণ্টনের পদ্ধতি আগেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কসাইকে পশুর মাংস বা চামড়া পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া বৈধ নয়।
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং মানুষের প্রয়োজন ও সুবিধা বিবেচনায় নতুন পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে সেই পদ্ধতি যেন ইবাদতের মূল চেতনাকে ক্ষুণ্ন না করে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সেই কাজকে সহজ করতে পারে, কিন্তু কোরবানির আধ্যাত্মিক অনুভূতি ও তাৎপর্য কেবল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই অনলাইনে কোরবানি দেওয়া বৈধ হলেও বিশ্বস্ততা, স্বচ্ছতা এবং শরিয়তের শর্তগুলো নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।
খবরটি শেয়ার করুন