ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১২ এপ্রিল প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) যান তারেক রহমান। ওই দিন তিনি একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার বিষয়টি আলোচনা আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা স্মৃতিচারণ ও পুরোনো ছবি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সেই সময়ের সহপাঠী ও পরিচিতজনদের বক্তব্যও নতুন করে আলোচনায় আসে।
ঢাবিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতির পর সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তার শিক্ষাজীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল আজ বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক পোস্টে জানান, তারেক রহমান একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে তৎকালীন এরশাদ সরকারের সময়কার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে তিনি নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেননি।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহপাঠীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অতি পরিচিত মানুষ রয়েছেন। জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বর্তমান বিচারপতি ফারাহ মাহবুব তারেক রহমানের সহপাঠী ছিলেন। এরশাদ প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। সম্ভবত নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তারেক রহমানের ঢাবির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
আসিফ নজরুলের এই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তারেক রহমানের শিক্ষাজীবনের অজানা দিকগুলো নতুন করে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বিষয়টিকে দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
এদিকে আশির দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ক্যাম্পাস। মিছিল, স্লোগান, ছাত্ররাজনীতির সংঘাত আর টানটান উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু করেছিলেন নোয়াখালীর হাতিয়া কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. শাহ ওয়ালী উল্লাহ। চার দশক পর সেই সময়ের একটি স্মৃতি সামনে এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে শাহ ওয়ালী উল্লাহ দাবি করেন, ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হারিয়ে যাওয়া ভর্তি–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। শুধু তা–ই নয়, তিনি নিজের চোখে তারেক রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন।
ফেসবুকে দেওয়া সেই স্মৃতিচারণ ছড়িয়ে পড়ার পর নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে আলোচনা। অনেকেই পোস্টটি শেয়ার করে নিজেদের মতামত দিচ্ছেন। কেউ এটিকে ‘ইতিহাসের একটি মানবিক মুহূর্ত’ বলছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য খুঁজছেন।
শাহ ওয়ালী উল্লাহ তার পোস্টে লেখেন, ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ভর্তি কার্যক্রম চলছিল। কলাভবনের নিচে সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। সে সময় ডিনের কক্ষের সামনে কিছু কাগজপত্র পড়ে থাকতে দেখেন। কাগজগুলো হাতে নিয়ে দেখেন, সেখানে এসএসসি ও এইচএসসির মূল মার্কশিটসহ ভর্তি–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি রয়েছে। নামের জায়গায় লেখা ছিল ‘তারেক রহমান’ এবং পিতার নাম ‘জিয়াউর রহমান’।
শাহ ওয়ালী উল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর এক তরুণকে উদ্বিগ্নভাবে একটি ফাইল খুঁজতে দেখেন। পরে তার হাতে কাগজপত্র তুলে দিলে তরুণটি হাসিমুখে ধন্যবাদ জানান। তখনই তিনি ধারণা করেন, এই তরুণই সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান।
স্মৃতিচারণে তিনি আরও লেখেন, তরুণটির চেহারার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের মিল খুঁজে পেয়েই বিষয়টি নিশ্চিত হন। পরে বিভিন্ন সূত্রেও তিনি জানতে পারেন, সেটি সত্যিই তারেক রহমানের কাগজপত্র ছিল।
শাহ ওয়ালী উল্লাহ শুধু ওই ঘটনার কথাই বলেননি, তুলে ধরেছেন আশির দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাও। তার ভাষ্য, তখন ক্যাম্পাস ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। প্রতিদিন মিছিল, মিটিং, সংঘর্ষ ও উত্তেজনায় টালমাটাল থাকত পরিবেশ। ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা সংঘাত, ছাত্রনেতা হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
তিনি স্মরণ করেন, একবার জিয়া হলের সামনে খালেদা জিয়ার একটি সভা চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক ছাত্রনেতার মৃত্যুর খবর আসে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, সেই বাস্তবতায় তারেক রহমানের মতো রাজনৈতিক পরিবারের একজন সদস্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও সহজ ছিল না।
ফেসবুক পোস্টে শাহ ওয়ালী উল্লাহ আরও উল্লেখ করেন, কয়েক মাস আগে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি এই স্মৃতির কথা আবার সামনে আনেন। ওই নেতা দাবি করেছিলেন, “তারেক জিয়া ইন্টারমিডিয়েটও শেষ করতে পারেননি।” এর প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “তারেক রহমান অনার্স শেষ করেছেন কি না, সেটা আমার জানা নেই। তবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন—এটি আমি নিজের চোখে দেখা ঘটনার ভিত্তিতেই বলেছি।”
এই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ ঘটনাটিকে নিছক মানবিকতা হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন উপাদান হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহবুব রশীদ নামের একজন লেখেন, “রাজনীতি যার যার জায়গায়, কিন্তু একজন মানুষ আরেকজনের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ফিরিয়ে দিয়েছেন—এটাই বড় কথা।” ঢাকার বাসিন্দা সাদিয়া রহমান মন্তব্য করেন, “আশির দশকের ঢাবির পরিবেশ নিয়ে এমন ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ এখন খুব কমই পাওয়া যায়। ঘটনাটি ইতিহাসের অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।”
তবে সবাই যে একইভাবে বিষয়টি নিয়েছেন, তা নয়। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী পরিচয়ে ফেসবুকে সক্রিয় রুবেল বড়ুয়া লেখেন, “চার দশক আগের স্মৃতি কতটা নির্ভুলভাবে মনে রাখা সম্ভব, সেটাও ভাবার বিষয়।” আবার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের বাসিন্দা নেটিজেন আরিফুল ইসলাম মন্তব্য করেন, “রাজনৈতিক বিভক্তির এই সময়ে এমন পোস্ট মানুষকে অতীত নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।”
স্থানীয় পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। হাতিয়া কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৃহস্পতিবার বিকেলে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, তাদের বিভাগের প্রধানের এই পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর ক্যাম্পাসেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকে পোস্টের স্ক্রিনশট শেয়ার করে মতামত দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “এই বিষয়ে তো আসলে যারা তখনকার সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তারাই বলবেন বা স্মৃতিচারণ করবেন। আমি এখন পর্যন্ত শুনতে পারিনি যে প্রধানমন্ত্রী নিজে এই বিষয়ে কিছু বলেছেন।” তিনি আরও বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক বক্তব্যে বিষয়টি সামনে এনেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ প্রায়ই আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে দেশের বড় রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের অতীত নিয়ে মানুষের আগ্রহ সব সময়ই বেশি। ফলে শাহ ওয়ালী উল্লাহর এই পোস্টও দ্রুত মানুষের নজর কেড়েছে।
তবে পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো একটি মানবিক মুহূর্তের স্মৃতি। চার দশক আগের সেই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে হারিয়ে যাওয়া একটি ফাইল হয়তো ছিল একজন তরুণ শিক্ষার্থীর উদ্বেগের কারণ। আর সেটি কুড়িয়ে ফিরিয়ে দেওয়া আরেক তরুণের কাছে ছিল নিছক দায়িত্ববোধ। সময়ের ব্যবধানে সেই ঘটনাই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
শাহ ওয়ালী উল্লাহর পোস্টের ভাষায়, “রাজনীতি নয়, মানুষের আচরণই শেষ পর্যন্ত স্মৃতিতে থেকে যায়।” তার এই বক্তব্যের প্রতিফলনই যেন দেখা যাচ্ছে নেটিজেনদের আলোচনায়। কেউ ইতিহাস খুঁজছেন, কেউ মানবিকতা; আবার কেউ দেখছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অতীতের এক ঝলক।
খবরটি শেয়ার করুন