ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটকে ঘিরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অর্থায়ন নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে দেশব্যাপী প্রচার চালাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা অনুদান নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসার পর সংগঠনের ভেতরেই মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।
এক পক্ষের নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, এই অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের তথ্য সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। তবে অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, প্রক্রিয়াটি ছিল নিয়মমাফিক এবং অর্থের নিরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে।
বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল)। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশাসহ কয়েক নেতা সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নেওয়া হলেও তা সংগঠনের অন্য নেতাদের জানানো হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে সিনথিয়া জাহীন বলেন, শুরুতে প্রচারের অর্থায়ন ব্যক্তিগত উদ্যোগে হবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরে জানা যায়, একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অন্তত এক কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই অর্থের উৎস ও ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব এখনো সংগঠনের সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ১২ এপ্রিল কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শীর্ষ নেতারা এই অর্থ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হন। তবে তাতেও পূর্ণাঙ্গ হিসাব দেওয়া হয়নি। এই অভিযোগের পটভূমিতে রয়েছে সংগঠনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনও।
সংবাদ সম্মেলনের তিন দিন আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সভাপতি রিফাত রশিদ, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামসহ কয়েকজন নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেন। একই দিন তারা সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগকে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অংশ হিসেবেও দেখছেন।
অভিযোগ ওঠার পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন রিফাত রশিদ। তিনি অভিযোগগুলোকে ‘হাস্যকর’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আখ্যা দেন। রিফাত বলেন, “আমাদের এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে বিতর্কিত করা এবং গণভোটের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এই অভিযোগ আনা হয়েছে। আমরা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি।”
তিনি আরও জানান, যেকোনো তদন্ত সংস্থা—দুদকসহ—যদি এ বিষয়ে তদন্ত করতে চায়, তাহলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করবেন এবং প্রয়োজনীয় সব নথি সরবরাহ করবেন।
রিফাত রশিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণভোটের আগে ‘ইয়েস ক্যাম্পেইন’ পরিচালনার জন্য সংগঠনটি অর্থের সন্ধানে ছিল। তখন বিভিন্ন ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহের একটি পরামর্শ আসে। সেই সূত্র ধরে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক–এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তিনি বলেন, “আমরা একটি বড় আকারের ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করেছিলাম। সেখানে কনসার্ট, ডোর-টু-ডোর প্রচার, অনলাইন ক্যাম্পেইন—সবই ছিল। মোট পরিকল্পনার বাজেট ছিল প্রায় ১২ কোটির মতো।”
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। প্রধান সমস্যা ছিল সংগঠনটির আইনি অবস্থান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনো নিবন্ধিত সংগঠন না হওয়ায় সরাসরি অর্থ দেওয়া সম্ভব ছিল না। এই বাধা কাটাতে ‘স্যাড’ নামে একটি ফাউন্ডেশন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করা হয় বলে জানান রিফাত।
রিফাত রশিদের বক্তব্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত পাঁচ কোটি টাকার একটি চুক্তি হলেও বাস্তবে এক কোটি টাকা প্রদান করা হয়। সময়স্বল্পতার কারণে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে হাতে সময় ছিল খুব কম। আমরা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রচার, ক্যারাভান, লিফলেট বিতরণ এবং ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছিলাম।”
এই অর্থের ব্যয় সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি দাবি করেন, একটি নিবন্ধিত অডিট ফার্ম দিয়ে পুরো হিসাব নিরীক্ষা করানো হয়েছে এবং সেই প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংক–এ জমা দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ব্যাংকের পক্ষ থেকেও কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি।
তবে সংগঠনের ভেতরের একাংশের দাবি, শুধু অডিট করানোই যথেষ্ট নয়—সংগঠনের সদস্যদের কাছেও পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা উচিত ছিল। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ গ্রহণের বিষয়টি আরও বেশি স্বচ্ছতার দাবি রাখে বলে মনে করছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে দুটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—প্রথমত, একটি অ-নিবন্ধিত সংগঠন কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক চুক্তিতে যায়; দ্বিতীয়ত, সংগঠনের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তথ্য শেয়ারিং কতটা গণতান্ত্রিক ছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া—কেউ স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী রাকিব হাসান লিখেছেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের টাকা নিয়ে ক্যাম্পেইন করলে সেটার হিসাব জনসমক্ষে দেওয়া উচিত। শুধু ‘অডিট হয়েছে’ বললেই তো হবে না।” অন্যদিকে নুসরাত জাহান মিথিলা নামের একজন মন্তব্য করেন,
“নির্বাচনের সময় অনেক সংগঠনই ফান্ড নেয়। এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টা বড় করে দেখানো হচ্ছে।” আরিফ মাহমুদ নামের এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “যদি সব কিছু বৈধ হয়, তাহলে শুরু থেকেই কেন বিষয়টা লুকানো হলো? এখানেই সন্দেহ।” আবার সায়েম রেজা লিখেছেন, “যে কেউ অভিযোগ করতে পারে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষারোপ করা ঠিক না। তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসুক।”
এই বিতর্ক শুধু একটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। গণভোটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অর্থায়নের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রভাবিত করতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, এই অভিযোগ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয় কি না এবং হলে সেখানে কী তথ্য উঠে আসে। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভেতরের বিভাজন ভবিষ্যতে কী রূপ নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, এক কোটি টাকার এই অনুদান শুধু একটি আর্থিক লেনদেনের প্রশ্ন নয়—এটি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক নৈতিকতার বড় একটি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন