ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৬ বছর বন্ধ থাকার পর আবারও সম্প্রচারে ফিরেছে বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান। গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৫৭ মিনিটে পুনরায় বাণিজ্যিক সম্প্রচার শুরু করা চ্যানেলটি ফিরেই আলোচনায় আসে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিডিআর বিদ্রোহ–পরবর্তী সময়ে এক সাবেক বিডিআর সদস্যের অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
চ্যানেল ওয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ভরাপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সাবেক বিডিআর সদস্য আশরাফুল হক টিপু সামান্য সৈনিক পদে চাকরি করেও এখন বিপুল সম্পদের মালিক। তার নামে ও স্ত্রীর নামে গড়ে উঠেছে একাধিক দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়ি, রয়েছে মাছের ঘের, মুরগি ও গরুর খামার। এছাড়া কয়েক একর জমি ক্রয়ের তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এমন বাড়ি ওই এলাকায় বিরল। গ্রামের অনেকেই হঠাৎ এই বিত্তবৈভবের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুললেও খোলাখুলি কথা বলতে অনেকে ভয় পান। কেউ কেউ আবার সরাসরি অভিযোগ করেন, পিলখানা ঘটনার সময় লুট হওয়া সম্পদের সঙ্গে টিপুর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
প্রতিবেশীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিডিআর বিদ্রোহের কয়েকদিন পরই টিপু নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। পরে আবার ঢাকায় গিয়ে আটক হন। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি পেনশন সুবিধাসহ মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে আরও সন্দেহ তৈরি করে। এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে টিপু নিজে কোনো সুস্পষ্ট উত্তর দেননি। তিনি কেবল বলেন, ‘একজন বড় গ্রামের লোক তদবির করে সেনাবাহিনী ছাড়াই দিয়েছে, তিনি আমেরিকায় আছেন।’ এই অস্পষ্ট বক্তব্য বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়—কীভাবে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি এত দ্রুত দায়মুক্তি পেলেন?
প্রতিবেদনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানের নাম উঠে আসা। অভিযোগ রয়েছে, টিপুকে বিচারের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টিপুর পরিবার তার আটক অবস্থায় মোস্তাফিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মোস্তাফিজুর রহমান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের লং আইল্যান্ডের হিক্স ভ্যালিতে বসবাস করেন। তার সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—সেখানে তিনি প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি কিনেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে অতীতে তিনি নিজেকে ‘দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা’ হিসেবেই দাবি করেছেন। ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়। ওই ঘটনায় বহু সেনা কর্মকর্তা নিহত হন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক তদন্ত, বিচার এবং শাস্তির মাধ্যমে ঘটনাটি মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়।
এত বছর পরও যদি ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে থাকে—এমন অভিযোগ উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি করে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলেন, পিলখানা ঘটনার পর রাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি সেই সময়ের বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জন করে থাকে, তাহলে তা পুনরায় তদন্তের দাবি রাখে।
এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রথমত, সম্পদের উৎস যাচাই; দ্বিতীয়ত, প্রভাব খাটিয়ে দায়মুক্তির অভিযোগ। উভয়ই প্রমাণিত হলে তা গুরুতর অপরাধ।অনেকের মতে, দেশে হঠাৎ সম্পদশালী হয়ে ওঠার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু যখন তা একটি জাতীয় ট্র্যাজেডির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এ ধরনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
চ্যানেল ওয়ানের এই প্রতিবেদন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকে এটিকে সাহসী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলছেন। ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফ হোসেন লিখেছেন, ‘যদি সত্যি হয়, তাহলে এটা শুধু দুর্নীতি না—জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, ‘প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বলা ঠিক না। তবে তদন্ত হওয়া উচিত।’
টুইটার (এক্স)–এ মাহিন চৌধুরী লেখেন, ‘চ্যানেল ওয়ান ফিরে এসে এমন প্রতিবেদন দিয়েছে—এটা ইতিবাচক। এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব সত্য বের করা।’ আরেকজন ব্যবহারকারী তানভীর হাসান বলেন, ‘পিলখানা নিয়ে এখনো অনেক অজানা গল্প আছে, হয়তো এটা তারই একটি অংশ।’ চ্যানেল ওয়ানের প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই এমন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করা অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি ইঙ্গিত করে যে চ্যানেলটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় গুরুত্ব দিতে চায়।
গণমাধ্যম গবেষকেরা বলছেন, ‘গণমাধ্যমের কাজ শুধু খবর দেওয়া নয়, বরং প্রশ্ন তোলা। তবে সেই প্রশ্ন যেন তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল হয়। এই ধরনের প্রতিবেদন জনমনে আলোচনার জন্ম দেয়, যা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়।
নেটিজেনদের মতে, চ্যানেল ওয়ানের প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত নয়, তবে তা গুরুত্বহীনও নয়। একজন সাবেক বিডিআর সদস্যের অস্বাভাবিক সম্পদ, প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং একটি জাতীয় ট্র্যাজেডির ছায়া—সব মিলিয়ে বিষয়টি গভীর তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, গণমাধ্যম এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—বিশেষ করে যখন তা সাহসিকতার সঙ্গে প্রশ্ন তোলে। তবে শেষ পর্যন্ত সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওপরই বর্তায়।
এখন দেখার বিষয়, এই প্রতিবেদন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি তা কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের পথ তৈরি করে।
খবরটি শেয়ার করুন