শনিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ঢামেকে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ আসিফ নজরুল, বেরোলেন বাগান গেট দিয়ে *** কাকরাইলে দুটি রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষে সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আইএসপিআরের বক্তব্য *** আসিফ নজরুলকে 'ভণ্ডামি বাদ দিতে' বললেন হাসনাত আবদুল্লাহ *** অনলাইনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে জেল ও জরিমানা *** মুরগি খাওয়া রোধে পাতা ফাঁদে ধরা পড়ল মেছো বাঘ *** আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সময় তাহলে ফুরিয়ে এল *** লতিফ সিদ্দিকী যা বললেন আদালতে *** ভারতে ইসলাম থাকবে, মানিয়ে নিতে শিখুন: আরএসএস প্রধান *** আটকের ১২ ঘণ্টা পর মামলা লতিফ সিদ্দিকী, শিক্ষক কার্জনসহ ১৬ জন কারাগারে *** নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জুতার মালা ও জেলের কথা মনে করিয়ে দিলেন ইসি

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে চারবার কেঁদেছি: আসিফ নজরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, ১৮ই আগস্ট ২০২৫

#

২০১২ সালে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুধু একটি আত্মজীবনী নয়—এটি একটি জাতির আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মত্যাগ আর নেতৃত্বের আদর্শের নির্মোহ দলিল। এই বই নিয়ে গভীর, মানবিক ও অন্তরস্পর্শী পাঠ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল—যিনি একজন খ্যাতিমান আইন বিশেষজ্ঞ, লেখক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক। এছাড়াও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন আসিফ নজরুল।

যিনি বরাবরই আওয়ামী লীগের নির্ভীক ও কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত, সেই আসিফ নজরুল যখন বলেন, ‘এই বইটি (অসমাপ্ত আত্মজীবনী) পড়ে আমি চারবার কেঁদেছি,’ তখন বোঝা যায়, এই বই যে কেবল রাজনৈতিক জীবনের দলিল নয়—তাতে আছে হৃদয়ের গভীর ডাক, ইতিহাসের অন্তর্লীন বেদনা, আর জাতির প্রেরণার উৎস।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশের পর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যনেল ‘বাংলাভিশন’—এর টকশোতে অংশ নিয়ে অধ্যাপক আসিফ নজরুল অকপটে জানান, তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে চারবার কেঁদেছেন। আবেগঘন মুহূর্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দাগ কেটেছে একটি ঘটনা—১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু যখন একেবারেই অর্থহীন অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ঠিক সেই সময়, এক গরীব বৃদ্ধা তাকে নিজের কুঁড়েঘরে বসিয়ে একবাটি দুধ, একটি পান এবং চার আনা পয়সা দেন নির্বাচনী খরচের জন্য। 

সেই বৃদ্ধার কাঁদতে কাঁদতে বলা কথাগুলো আজও অধ্যাপক নজরুলের কানে বাজে—‘বাবা, দুধটা খাও, পয়সা কটা তুমি নাও, আমার আর কিছু দেওয়ার নাই।’ এই ঘটনাটি শুধু এক ব্যক্তির দরিদ্রতা নয়, বরং এক নেতার প্রতি জনমানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থ আস্থার এক মহাকাব্যিক প্রতিচ্ছবি। অধ্যাপক নজরুল বলেন, এমন সম্পর্ক, এমন আত্মত্যাগ এখনকার রাজনীতিতে কল্পনাও করা যায় না।

প্রসঙ্গত, শেখ মুজিবের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি তার লেখা নয়, এটি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারীর ‘লেখা’ বলে বেসরকারি টিভি চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ১৬ই আগস্ট, শনিবারে প্রচারিত চ্যানেলটির এই প্রতিবেদন ইতোমধ্যে ভাইরাল (আলোচিত)। এই প্রতিবেদনের লিংক শেয়ার করে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী আলোচনা চলছে। পুলিশের যে শাখা থেকে ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ পাওয়ার ভিত্তিতে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনটি সাজানো হয়েছে, এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক নেটিজেন।

লেখক ও সাংবাদিক সমাজ বলছে, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ওই প্রতিবেদন ভিত্তিহীন। মূলত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইয়ের তথ্য সংগ্রহে ভূমিকা রেখে জাবেদ পাটোয়ারী ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ২০১৮ সালে শেখ হাসিনার সরকার তাকে পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জাবেদ পাটোয়ারীর ভূমিকা বিতর্কিত ছিল। তবে তার সঙ্গে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের কোনোভাবে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার কথা জানা যায়নি।

এমন আলোচনার মধ্যে আবার ভাইরাল হয়েছে বাংলাভিশনের ‘ফ্রন্ট লাইন’ টকশোতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সম্পর্কে মূল্যায়ন। বাংলাভিশনে টকশোটি প্রচারিত হয় ২০১৩ সালের ১৫ই আগস্টে। 

‘এই বই আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে’

বইটি অধ্যাপক আসিফ নজরুলের কাছে শুধু আবেগের নয়, বিচক্ষণ ও নির্মোহ বিশ্লেষণেরও উৎস। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে কোথাও নিজেকে গৌরবান্বিত করেননি বা শত্রুদের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করেননি। এমনকি যারা ভবিষ্যতে তাকে হত্যা করবেন—তাদের সম্পর্কেও কোনো ঘৃণা প্রকাশ নেই। বিশেষ করে খন্দকার মোশতাক সম্পর্কিত বিবরণে বঙ্গবন্ধুর যে সংযম ও নিরপেক্ষতা, তা অধ্যাপক নজরুলকে অভিভূত করে তোলে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘একমাত্র নিজের ঘটনা নিজে ছাড়া এভাবে নির্মোহভাবে লেখা সম্ভব নয়।’

বঙ্গবন্ধু ইতিহাস বিকৃত করেননি, নিজের বিপক্ষেও সত্য বলে গেছেন—এই সত্যনিষ্ঠা বইটিকে ইতিহাসের অনন্য দলিল করে তুলেছে। অধ্যাপক নজরুলের মতে, এই বই শুধু ইতিহাস জানার জন্য নয়, এটি আজকের রাজনীতিবিদদের আত্মদর্শনের জন্য এক আয়না। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ছিল ত্যাগ, আদর্শ ও জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, সন্তানের মুখ না দেখেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক নজরুল বলেন, ‘এই বই পড়ে বোঝা যায়, আজকের রাজনীতি কোথায় নেমে গেছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নিজেদের তুলনা করলে বোঝা যায়—আমরা কতটা দূরে সরে গেছি।’ তিনি মনে করেন, বইটি কেবল আওয়ামী লীগ নয়, সব রাজনৈতিক দলের জন্য আত্মসমালোচনার এক প্ল্যাটফর্ম। এটি বোঝার বই, উপলব্ধির বই—শুধু রাজনীতিবিদদের জন্য নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য।’

আত্মজীবনী নয়, জাতির আয়না

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অধ্যাপক আসিফ নজরুলের চোখে কেবল বঙ্গবন্ধুর আত্মকথা নয়, বরং একটি আত্মমগ্ন জাতির জাগরণ ডাকে। একজন কঠোর সমালোচকের চোখ দিয়েই যখন একজন নেতার সত্য ও ত্যাগ এমনভাবে প্রতিফলিত হয়, তখন তা শুধু সাহিত্য নয়—তা হয়ে ওঠে প্রেরণা। আজ যারা রাজনীতি করেন, জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেন কিংবা ইতিহাস জানতে চান—তাদের সবার জন্য এই বই একটি পাঠ্য নয়, পাঠযোগ্যতার ঊর্ধ্বে আত্মজিজ্ঞাসার দলিল।

বঙ্গবন্ধু শুধু ইতিহাসের অংশ নন, তার লেখা এই বইতে তিনি হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের সত্যিকারের ভাষ্যকার। আর অধ্যাপক আসিফ নজরুলের মতো একজন সমালোচকের আবেগ-ভেজা বিশ্লেষণ, সেই ইতিহাসকে করেছে আরও জীবন্ত, আরও মানবিক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসমাপ্ত আত্মজীবনী অধ্যাপক আসিফ নজরুল

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন