ছবি: সংগৃহীত
দেশে জঙ্গি তৎপরতা আছে কি নেই—সরকারের উচ্চপর্যায়ের দুই দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একই দিনে দেওয়া এই ভিন্নধর্মী বার্তা শুধু রাজনৈতিক পর্যায়েই নয়, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান আজ মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, দেশে জঙ্গি রয়েছে, তবে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক নয়। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ আরেক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, বর্তমানে দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য কেবল ভাষাগত নয়—এটি বাস্তবতা মূল্যায়ন, নিরাপত্তা কৌশল এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকেও ইঙ্গিত করে।
সকালে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে জঙ্গি উপস্থিতি রয়েছে, তবে তা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। তিনি আরও দাবি করেন, অতীত সরকারগুলো জঙ্গিবাদকে কখনো অতিরঞ্জিত করেছে, আবার কখনো একেবারেই অস্বীকার করেছে—যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, দুপুরে কোস্ট গার্ডের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, উগ্রবাদী বা চরমপন্থী গোষ্ঠী বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল পার্থক্যটি “উপস্থিতি” বনাম “তৎপরতা” শব্দদ্বয়ের ব্যবহারে। একজন বলছেন জঙ্গি আছে, অন্যজন বলছেন সক্রিয় কার্যক্রম নেই—এই সূক্ষ্ম পার্থক্যই বিভ্রান্তির জন্ম দিচ্ছে।
সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে ভিন্ন একটি চিত্র উঠে এসেছে। তাদের তালিকা অনুযায়ী, ১৬১১ জন জঙ্গি বর্তমানে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বা মাঠে রয়েছে। এদের বড় অংশই বিভিন্ন সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার সংগঠিত হচ্ছে।
তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২৩১ জন জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। এর সঙ্গে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে আরও ৩৮০ জন যুক্ত হয়েছে। এই নতুন জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য রয়েছে—যেমন আনসার আল ইসলাম, জেএমবি, নব্য-জেএমবি, হিযবুত তাহরীরসহ আরও কয়েকটি গোষ্ঠী।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—এই তালিকার ১১৪ জন জামিন পাওয়ার পর আদালতে আর হাজির হননি এবং ৯৬ জনের অবস্থান অজানা। এছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযুক্ত অন্তত ৩৭০ জন এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পলাতক জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সরকারি বক্তব্যে ‘দ্বিধা’ থাকলেও বাস্তব পদক্ষেপে সতর্কতার ছাপ স্পষ্ট। জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় দেশের আটটি বিমানবন্দরসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় (কেপিআই) বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের সতর্কতা সাধারণত তখনই নেওয়া হয়, যখন কোনো না কোনো গোয়েন্দা তথ্য সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। ফলে “কোনো তৎপরতা নেই” বক্তব্যের সঙ্গে এই প্রস্তুতির একটি অদৃশ্য টানাপোড়েন তৈরি হয়।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশের ১৬টি কারাগারে ১৬২ জন জঙ্গি বন্দি রয়েছেন। এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন আসামিও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জঙ্গিবাদ দমনে শুধু গ্রেপ্তার বা বিচারই যথেষ্ট নয়; জামিনপ্রাপ্তদের পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং নজরদারি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গাটিতেই বাংলাদেশ এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, জঙ্গিবাদ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি কখনো পুরোপুরি শূন্যে নেমে আসে না। বরং কম-বেশি সক্রিয় থাকে। তাই ‘নেই’ বা ‘আছে’—এই বাইনারি বক্তব্য বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিত বার্তা দেওয়া জরুরি, নইলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
অনেক সময় সরকার রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। এতে বিনিয়োগ, পর্যটন বা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির বিষয় জড়িত থাকতে পারে।
এদিকে সরকারের এই দ্বৈত বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঢাকার বাসিন্দা রিয়াজ হোসেন ফেসবুকে লিখেছেন, “একজন বলছেন আছে, আরেকজন বলছেন নেই—আমরা আসলে কাকে বিশ্বাস করব?”
চট্টগ্রামের নেটিজেন নুসরাত জাহান মন্তব্য করেন, “বাস্তবতা হয়তো মাঝামাঝি কোথাও। কিন্তু জনগণকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া উচিত।” আরেকজন ব্যবহারকারী, মাহমুদ তানভীর লিখেছেন, “যদি সত্যিই ঝুঁকি না থাকে, তাহলে বিমানবন্দরে এত নিরাপত্তা কেন বাড়ানো হলো?”
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, জঙ্গি ইস্যু বাংলাদেশে বরাবরই রাজনৈতিক ভাষ্যের অংশ হয়ে এসেছে। অতীতে এই ইস্যু কখনো কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার যুক্তি হিসেবে, আবার কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে অতীত সরকারের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গিবাদকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার’ করার অভিযোগও এই প্রেক্ষাপটকে সামনে নিয়ে আসে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, দেশে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, তবে বড় ধরনের তৎপরতা দৃশ্যমান নয়—এমন একটি ‘লো-ইনটেনসিটি’ বাস্তবতা থাকতে পারে। এই অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গোয়েন্দা নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার সমন্বয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে সমাজভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, অনলাইন উগ্রবাদ মোকাবিলা এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।
জঙ্গি ইস্যুতে সরকারের দুই ভিন্নমুখী বক্তব্য কেবল তথ্যগত বিভ্রান্তিই তৈরি করেনি, বরং এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বার্তার সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বাস্তবতা যাই হোক, জনআস্থা বজায় রাখতে স্পষ্ট, সমন্বিত এবং তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ অপরিহার্য—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খবরটি শেয়ার করুন