ফাইল ছবি
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনিস আলমগীর বলেছেন, আসিফ মাহমুদদের ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কথা ‘ডিপ স্টেট’ বলেছিল—এমন দাবি ‘চরম মিথ্যাচার’। তার মতে, বাস্তব পরিস্থিতি উল্টো প্রমাণ করে যে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তীব্র চাপ, আলোচনা ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে।
সম্প্রতি দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন আনিস আলমগীর। অনুষ্ঠানে তিনি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ এবং ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেন।
আনিস আলমগীর বলেন, যদি সত্যিই আসিফ মাহমুদদের ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকার অনুমতি দেওয়া হতো, তাহলে মুহাম্মদ ইউনূস কি সহজে ক্ষমতা ছাড়তেন? তার ভাষ্য, ইউনূসকে ক্ষমতা ছাড়াতে দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ প্রয়োগ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “ইউনূসের গদি ছাড়ানোর জন্য কত পরিশ্রম করতে হলো—মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়েছে, তাকে নিয়ে বৈঠক করতে হয়েছে, এমনকি লন্ডন পর্যন্ত যেতে হয়েছে। এরপর সেনাপ্রধান ধাপে ধাপে নির্বাচনের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন।”
এই প্রক্রিয়াকে তিনি একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক টানাপোড়েন হিসেবে বর্ণনা করেন। তার দাবি, ক্ষমতার এই পরিবর্তন কোনো সহজ বা পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়নি।
টকশোতে ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গ তুলে আনিস আলমগীর বলেন, উন্নত দেশগুলোতে ডিপ স্টেট একটি স্বীকৃত ধারণা হলেও অনুন্নত দেশগুলোতে এর কার্যকারিতা ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশেও এই ধারণা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, “ওয়ান ইলেভেন বা ইউনূসের ক্ষমতায় আসা—অনেকে বিশ্বাস করেন, এখানে ডিপ স্টেটের ভূমিকা ছিল।” তার ব্যাখ্যায়, ডিপ স্টেট বলতে দেশের সামরিক, গোয়েন্দা ও অর্থনৈতিক অভিজাত গোষ্ঠী এবং এনজিও খাতের প্রভাবশালী অংশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক ধরনের অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামোকে বোঝানো হয়, যা রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি ‘রাষ্ট্র’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
আনিস আলমগীর আরও বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেনাবাহিনীর একটি বৈঠক থেকে সরকারের প্রতি সমর্থনের বিষয়ে ‘অলিখিত না’ আসার পর থেকেই একটি ধারাবাহিক সংকেত তৈরি হয়।
তার দাবি, এই প্রক্রিয়াগুলো মিলিয়ে বোঝা যায় যে ক্ষমতার পরিবর্তনে ডিপ স্টেটের ভূমিকা ছিল। তবে আসিফ মাহমুদদের ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকার প্রসঙ্গটি তিনি সরাসরি নাকচ করেন। তার ভাষায়, “এটা একদম চরম মিথ্যাবাদিতা।”
এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের উদাহরণ টেনে বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রায়ই দ্বৈত মানদণ্ড দেখা যায়। “২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকা হারাম, কিন্তু আগের টেনিওর হালাল—এ ধরনের বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়,” বলেন তিনি।
আনিস আলমগীর অভিযোগ করেন, ক্ষমতা ছাড়ার প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের চিঠি চালাচালি, মতবিরোধ ও রাজনৈতিক দরকষাকষি হয়েছে। তার মতে, এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
তিনি বলেন, “যে নির্বাচন তিন বা ছয় মাসে করা সম্ভব ছিল, তা ১৮ মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।” তার ভাষায়, এই দীর্ঘ সময় দেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।
টকশোতে দেওয়া আনিস আলমগীরের এসব বক্তব্য ইতিমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ‘ডিপ স্টেট’ এবং ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে তার বিশ্লেষণ বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
তবে তার মন্তব্যগুলো মূলত একটি বিষয়কেই সামনে আনে—ক্ষমতার রাজনীতিতে বাস্তবতা, প্রচার ও ব্যাখ্যার মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, সেটিই এখন বিতর্কের বিষয়।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন