ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ও কিছু ছবি ঘিরে তুমুল আলোচনা চলছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কুকুর দিঘির পানিতে পড়ে গেলে একটি কুমির সেটিকে টেনে নিয়ে যায়। পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান (রহ.)-এর মাজার এলাকার দিঘিতে কুমিরকে খাওয়ানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কুকুরটিকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
কেউ কেউ আরও এগিয়ে বলছেন, কুকুরটির পা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, আর উপস্থিত মানুষ ভিডিও ধারণ করে ‘মজা’ নিয়েছে। তবে স্থানীয় এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নানাভাবে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো দাবির সঙ্গে মিলছে না। বরং ঘটনাটি ছিল আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত—এমনটাই বলছেন মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাকর্মী এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে মাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দিঘির প্রধান ঘাটে দর্শনার্থীদের ভিড়। অনেকে কুমির দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন, আবার কেউ কেউ নিজেদের স্মার্টফোনে ভাইরাল ভিডিও দেখাচ্ছেন অন্যদের। কথোপকথনে বারবার উঠে আসছে—‘এখানেই কুকুরটাকে ধরেছিল’, ‘কুকুর খেতে দেওয়া হয়েছে’—এমন মন্তব্য।
স্থানীয় এক কলেজশিক্ষার্থী মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, “ভিডিওগুলোতে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ। সবাই বলতেছে কুকুরটারে খাওয়ানো হইছে।” তার দেখানো ভিডিওগুলোর অনেকগুলোতেই নাটকীয় বর্ণনা যুক্ত করা হয়েছে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে একজন ব্যবহারকারী দাবি করেন, “একটা কুকুর বাঁচার জন্য ছটফট করছিল, কিন্তু কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি”—এমন আবেগঘন বর্ণনায় শত শত মন্তব্য জমা হয়েছে। তবে পোস্টটির সঙ্গে থাকা ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাপ্রহরী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গত ৮ এপ্রিল, বুধবার বিকেলে। ওই দিন একটি অসুস্থ কুকুর আচমকা দিঘির আশপাশে থাকা কয়েকজনকে কামড়ায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, কুকুরটির আচরণ অস্বাভাবিক ছিল এবং সেটি সামনে যাকে পাচ্ছিল তাকেই তাড়া করছিল।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, কুকুরটির মাথায় ক্ষত ছিল এবং সেটি কয়েকজনকে কামড়ানোর পাশাপাশি দুই-তিনটি মুরগিও মেরে ফেলে। এতে আতঙ্কিত হয়ে কয়েকজন সেটিকে তাড়ানোর চেষ্টা করেন। লাঠি ছুড়ে মারা হলে কুকুরটি দৌড়ে নারীদের ঘাট থেকে প্রধান ঘাটের দিকে চলে যায়।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাজারের নিরাপত্তাপ্রহরী মো. ফোরকান হাওলাদার।
তিনি মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে জানান, “আমি তখন মানুষকে দিঘিতে নামতে নিষেধ করছিলাম, কারণ কুমির ঘাটের কাছে আসছিল। ওই সময় কুকুরটা এসে আমাকে আঁচড় দেয়। আমি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটা পানিতে পড়ে যায়। তখনই কুমিরটা ধরে নিয়ে যায়।”
তিনি আরও জানান, কুকুরের আঁচড়ে আহত হয়ে তিনি পরদিন বাগেরহাট জেলা হাসপাতাল থেকে টিকা নিয়েছেন।
মাজার এলাকার দোকানি বিনা আক্তার বলেন, “কুকুরটা আগে কয়েকজনকে কামড়াইছে, এমনকি একটা ছোট বাচ্চাকেও। পরে পানিতে পড়ে গেলে কুমির ধরছে। এখন মানুষ এটা নিয়ে বানানো গল্প ছড়াচ্ছে।”
অন্যদিকে, স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান তপু, যিনি দিঘির কুমির নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত, বলেন, “এই সময় কুমিরটা ডিম পাড়ছে। তখন তারা একটু বেশি হিংস্র হয়। কুকুরটা সামনে পড়ে যাওয়ার পর কেউ নামতে সাহস পায়নি—এটা স্বাভাবিক।”
তিনি আরও বলেন, “এটা ইচ্ছা করে খাওয়ানো হয়েছে—এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। বরং কেউ নামলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।”
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার জন্য অনেক সময় ঘটনার আংশিক অংশ তুলে ধরে অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর বর্ণনা দেওয়া হয়। বিশেষ করে আবেগঘন বা চমকপ্রদ ঘটনা হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, ভিডিওর ছোট একটি অংশ—যেখানে কুকুরটিকে কুমির ধরে—সেটি আলাদাভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর আগে কী ঘটেছিল, কেন কুকুরটি সেখানে গিয়েছিল—এই প্রেক্ষাপট অনেক পোস্টে অনুপস্থিত।
এ ছাড়া, এআই দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার করে ‘ঘটনাকে নাটকীয়’ করে তোলার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে, যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করছে।
বাগেরহাটের এই মাজারটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দিঘির কুমির নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা গল্প ও লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে। তবে মাজারের খাদেমরা জানিয়েছেন, বর্তমানে দিঘিতে মাত্র একটি কুমির রয়েছে এবং এটি ঐতিহাসিক সেই ‘পুরনো কুমির’ নয়। ২০০৫ সালে ভারত থেকে এনে কুমিরটি এখানে ছাড়া হয়।
নেটিজেনরা বলছেন, ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা আবারও মনে করিয়ে দেয়—কোনো ভিডিও বা ছবি দেখে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে যখন ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট জানা থাকে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। একই সঙ্গে, জনসমাগমপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদার এবং অসুস্থ বা উন্মত্ত প্রাণী দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে, দিঘির কুমিরের ‘কুকুর খাওয়ানো’ নিয়ে ভাইরাল হওয়া ঘটনাটি বাস্তবে ছিল একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরঞ্জন ও অপতথ্য সেটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে—যা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
খবরটি শেয়ার করুন