সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বাড়ছে হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের হুঁশিয়ারি *** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি ঝড়ের আভাস *** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার

শেখ হাসিনার বক্তব্য থামাতে ঢাকার অনুরোধ, দিল্লি কি অবস্থান বদলাবে?

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন, ৪ঠা আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি তুলেছে বাংলাদেশ সরকার। গতকাল ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানান। তিনি অনুরোধ করেন, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা যেন রাজনৈতিক বক্তব্য না দেন বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করেন, সে বিষয়ে ভারত সহযোগিতা করে।

এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই ধরনের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে ভারতীয় হাইকমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভারতের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

এক বছরের ব্যবধানে দুই সরকারের পক্ষ থেকে একই ধরনের বার্তা দিল্লির কাছে পৌঁছাল। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের অনুরোধে ভারত কি শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া বন্ধ করবে? নাকি আগের মতোই নিজেদের অবস্থানে অটল থাকবে?

ভারতের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি যে, শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে দিল্লি বলেছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিষয়গুলো ভারতের আইন, কূটনৈতিক রীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আলোকে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ভারতের অবস্থান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেশটির সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ভারতীয় গণমাধ্যমে বলেছেন, ভারত শেখ হাসিনাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তার প্রতিটি রাজনৈতিক বক্তব্য ভারতের সরকারি অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। তার মতে, ভারত একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখতে চায়। ফলে দিল্লি এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইবে না, যাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রিও একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছেন। তিনি সুখবর ডটকমকে বলেন, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এর সঙ্গে আইনি বিষয়ও জড়িত। কোনো বিদেশি নাগরিক ভারতে অবস্থান করলে তার ক্ষেত্রে ভারতীয় আইনই প্রযোজ্য হবে। ফলে সরকার চাইলে কিছু কার্যক্রম সীমিত করতে পারে। আবার আইনের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাই বিষয়টি সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক হর্ষ ভি. পান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাও ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অংশীদার। ফলে দিল্লি দুই দিকেই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। তার মতে, ভারত এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না, যা তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক সি. উদয় ভাস্করও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার ভাষ্য, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে ভারত তাৎক্ষণিক চাপের ভিত্তিতে নীতি বদলায় না। শেখ হাসিনাকে ঘিরেও দিল্লির নীতি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হিসাবের অংশ।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব সঞ্জয় ভট্টাচার্য সোমবার রাতে সুখবর ডটকমকে বলেন, কোনো আশ্রয়প্রাপ্ত বিদেশি নেতার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা হবে কি না, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, আইন এবং ভারতের বৃহত্তর কূটনৈতিক স্বার্থের ওপর। এটি কেবল বাংলাদেশের অনুরোধের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না।

বিবিসি বাংলার দিল্লি প্রতিনিধি শুভজ্যোতি ঘোষের একাধিক প্রতিবেদনে ভারতীয় বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব কম। কারণ, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই তাকে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও দিল্লির কৌশলগত মূল্যায়নে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি।

ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া-এর বিভিন্ন বিশ্লেষণেও একই ধরনের মূল্যায়ন উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলেও ভারত শেখ হাসিনাকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার পথে হাঁটেনি। দিল্লি বরং অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের নীতি অনুসরণ করছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদেরও অনেকে মনে করেন, ভারতের সামনে দুটি বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা। অন্যদিকে শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখা। এ দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই এখন দিল্লির প্রধান লক্ষ্য।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত চাইলে প্রশাসনিকভাবে শেখ হাসিনার কিছু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করতে পারে। তবে সম্পূর্ণভাবে তাকে কোনো বক্তব্য দিতে নিষেধ করা সহজ নয়। কারণ, এর সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ আইন, মতপ্রকাশের অধিকার এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রশ্ন জড়িত। ফলে বাংলাদেশ যতবারই অনুরোধ জানাক না কেন, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভারত তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে।

গত এক বছরে ঘটনাপ্রবাহও সে দিকেই ইঙ্গিত করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ একই অনুরোধ জানিয়েছিল। বর্তমান সরকারও একই অনুরোধ করল। কিন্তু ভারত এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউনূস সরকারের সময় ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। সীমান্ত, নিরাপত্তা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে টানাপোড়েন দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছিল। তারপরও ভারত শেখ হাসিনাকে নিয়ে তাদের মৌলিক অবস্থান পরিবর্তন করেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা শুরু হলেও শেখ হাসিনার প্রশ্নে দিল্লির অবস্থান একই রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দিল্লি ব্যক্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। সেই কারণে শেখ হাসিনার বিষয়ে তারা হঠাৎ করে অবস্থান পরিবর্তন করবে—এমন সম্ভাবনা খুব বেশি দেখছেন না তারা। তবে একই সঙ্গে তারা এটিও মনে করেন, ভারত চাইবে না তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে এমন কোনো কর্মকাণ্ড হোক, যা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

ফলে বাংলাদেশের অনুরোধের পরও শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়া থেকে ভারত সরাসরি বিরত রাখবে কি না, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই। তবে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশের মূল্যায়ন হলো, দিল্লি এ বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক বা নাটকীয় পদক্ষেপের বদলে আগের মতোই সতর্ক, ধীর এবং কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখবে।

শেখ হাসিনা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250