ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালুর পর আবারও দেশের বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয় করল সরকার। জুন মাসের জন্য ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পেট্রলের দাম ১৪০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। রোববার (৩১ মে) রাত ১২টা থেকে এই মূল্য কার্যকর হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সমন্বয় করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, এটি শুধু বাজারদরের প্রতিফলন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির সক্ষমতা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তারও বহিঃপ্রকাশ।
গত কয়েক মাসে দেশের জ্বালানি বাজার একাধিক ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে। এপ্রিল মাসে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর মে মাসে তা অপরিবর্তিত রাখা হলেও জুনে আবার মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে জনমনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২২ সালের আগস্টে, যখন এক লাফে ডিজেলের দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ বাড়ানো হয়।
ওই সিদ্ধান্তের পর পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীকালে কিছুটা সমন্বয় করা হলেও সেই সময়ের অভিঘাত দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করে। এর ফলে প্রতি মাসে আমদানি ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে জ্বালানির দাম পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে।
সরকারের মতে, এই পদ্ধতি বাজারে স্বচ্ছতা আনে এবং হঠাৎ বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা কমায়। তবে বাস্তবে এই ব্যবস্থার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাবও সরাসরি ভোক্তাদের ওপর এসে পড়ছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই বিবেচনাতেই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পরিবহন ও কৃষি খাত মূলত ডিজেলনির্ভর। ডিজেলের দাম বাড়লে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, সেচব্যবস্থা এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয় একযোগে বাড়ে।
ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও দ্রুত বাড়তে পারে। সরকার সম্ভবত সেই ঝুঁকি এড়াতেই ডিজেলের দাম স্থির রেখেছে। অন্যদিকে পেট্রল ও অকটেন মূলত ব্যক্তিগত যানবাহন এবং কেরোসিন সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হওয়ায় এই খাতে মূল্য সমন্বয় তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত মূলত সরকারের আর্থিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করে অভ্যন্তরীণ বাজারে কম দামে বিক্রি করতে গেলে রাষ্ট্রকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে সেই ভর্তুকি বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন বোঝা তৈরি করবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও মূল্য সমন্বয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, জ্বালানি ভর্তুকির সুবিধা সব শ্রেণি সমানভাবে পায় না; বরং বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী সচ্ছল জনগোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি সুবিধা ভোগ করে। ফলে করদাতাদের অর্থ ব্যয় করে সার্বজনীন ভর্তুকি বজায় রাখার চেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
তিনি মনে করেন, কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে রাখলে জ্বালানি সংকট, কালোবাজারি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালানের মতো সমস্যাও বাড়ে।
তবে মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিবহন ব্যয় বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যবসায়ীরা সাধারণত অতিরিক্ত পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করেন। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে ভর্তুকিনির্ভর নীতি টেকসই নয়। কিন্তু মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করলে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে নগদ অর্থ সহায়তা, ভাউচার বা লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মতো ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে চালুর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে, অন্যদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবে।
জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধি তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, ভর্তুকির চাপ এবং মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে সরকার।
প্রশ্ন হলো, এই ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াসে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়বে এবং সেই চাপ মোকাবিলায় সরকার কতটা কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে পারবে। আগামী মাসগুলোতে সেই উত্তরই দেশের অর্থনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন